• সিলেট, রাত ৪:৪৩, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ভারতে কি মুসলিম নিধন শুরু হয়ে গেছে ?

admin
প্রকাশিত মে ১১, ২০২৬
ভারতে কি মুসলিম নিধন শুরু হয়ে গেছে ?

সম্পাদকীয় পশ্চিমবঙ্গের নতুন মুখ্যমন্ত্রী হলেন শুভেন্দু অধিকারী, যাকে ঘোরতর মুসলিমবিরোধী বললে ভুল হয় না। সদ্যসমাপ্ত বিধান সভা নির্বাচনের ফল বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি বলতে থাকেন, বিজেপিকে হিন্দুরা ভোট দিয়েছে, মুসলিমরা দেয়নি। বহুদিন যাবৎ রাজ্যের বিশেষত বাঙালি মুসলিমদের প্রকাশ্যে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে তিনি আখ্যা দিয়ে আসছেন। তাঁর ভাষায়, ওই ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহযোগিতায় বাংলাদেশ থেকে সেখানে গিয়েছেন, তাই তাদের তাড়ানো হবে। স্বাভাবিকভাবেই শুভেন্দুর নেতৃত্বে বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ দখলের পর বাংলাদেশের মানুষদের চিন্তিত হওয়ার অবকাশ তৈরি হয়েছে । বাংলাদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লম্বা এক সীমান্ত রয়েছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নানা ইস্যুতে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সীমান্ত হত্যা তো লেগেই আছে। ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের’ অভিযোগ তুলে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে বাংলাদেশি দেখলেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিএসএফ আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি উপেক্ষা করে গুলি চালায়। এ নিয়ে বাংলাদেমের অভ্যন্তরে ক্ষোভ ও উদ্বেগ ক্রমশই বাড়ছে। এর মধ্যে শুভেন্দুর ওই বাঙালি মুসলিমবিরোধী ঘৃণা ও হুশিয়ারি, নিঃসন্দেহে, তা বাড়াবে।ভারতের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সংকীর্ণ হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও সীমান্তনির্ভর রাজনীতি শক্তিশালী হয়েছে। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ, জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ প্রসঙ্গ বিজেপির রাজনৈতিক ভাষণে বড় জায়গা দখল করে আছে। শুভেন্দু অধিকারীও সেই ধারার একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখ, যিনি বিজেপির হয়ে বারবার এই ধারার রাজনীতি উসকে দিচ্ছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রায়ই বাংলাদেশি অভিবাসীদের নিরাপত্তা ও সামাজিক ভারসাম্যের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব মন্তব্য পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয় উত্তেজনা ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। প্রথমত, ভারতের সরকারপ্রধান নরেন্দ্র মোদি এবং রাজনৈতিক শ্রেণি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে একচ্ছত্রভাবে মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদানের প্রেক্ষিতেই বিবেচনা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব খাটো করে দেখে, যা কোনোভাবে কাম্য নয়। ফলে ইতিহাস নিয়ে একটা জটিল দ্বন্দ্ব রয়েছে।
এর বাইরে বিশেষত সাম্প্রতিককালে বিজেপি নেতাদের বক্তব্য। পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের কোনো রাজনৈতিক নেতার মুখে বাংলাদেশিদের নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, এটি দুই দেশের জনগণের সম্পর্কেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তবে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সম্পর্ক। এ ছাড়া রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে বাংলাদেশ-ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্কটাও গুরুত্বপূর্ণ। তদুপরি, দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি অনেক গভীর। বাণিজ্য, বিদ্যুৎ সহযোগিতা, নিরাপত্তা, নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা–এসব বিষয়ে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বিদ্যমান। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার একদিকে জাতীয়তাবাদী অবস্থান ধরে রাখলেও, অন্যদিকে বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখতে সচেষ্ট। কারণ দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। কিন্তু ভারতের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী যে ধরনের আচরণ করছে, তা অনেক ক্ষেত্রে বিবাদ বাড়িয়ে তুলছে।

যখন ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দবন্ধ রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন সীমান্ত এলাকায় বসবাসরত সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও বিভাজন বাড়ে। এর ফলে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি জটিল হতে পারে, এমনকি দুই দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের সামাজিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
দিল্লিকে বুঝতে হবে, বাংলাদেশের জনগণকে অসম্মান করে বা হেয় করে কোনো রাজনৈতিক লাভ হলেও তা দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের বন্ধুত্বের জন্য ক্ষতিকর।এখানে বাংলাদেশেরও দায়িত্ব রয়েছে। আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়ার বদলে কূটনৈতিক পরিপক্বতা দেখানো জরুরি।

দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বাস্তববাদ এবং রাজনৈতিক সংযমের ওপর। পরস্পরের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে উত্তেজনা বাড়িয়ে নয়, বরং সহযোগিতা জোরদার করেই দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান নেতৃত্বের ভূমিকা এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভোটের সমীকরণ মিলাতে যে যাই বলুন না না কেন, অন্তত দুই দেশের সম্পর্ক বিবেচনায় সকলেরই রাজনৈতিক আচরণ দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।

এই নিউজ ৯১ বার পড়া হয়েছে