• সিলেট, রাত ৩:১৫, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামালের বিরুদ্ধে

admin
প্রকাশিত মে ১৮, ২০২৬
ঘুষ-দুর্নীতি-অনিয়ম-স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা সরোয়ার কামালের বিরুদ্ধে

কবির আহমেদ মানিক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস.এম সরোয়ার কামালের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলার সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালানো হচ্ছে উল্লেখ করে ভুক্তভোগী মহলের পক্ষ থেকে চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে অভিযোগ রয়েছে, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার এই বিশাল ঘুষ-দুর্নীতির নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনায় মাঠ পর্যায়ে জড়িত আছেন কর কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ, মোঃ রাশেদ ও দবির আলম চৌধুরীসহ আরও বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অনুসন্ধানের মুখে পত্রিকা অফিসে এসে কর্মকর্তা মজিদের শাসানি!, সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের ৪০ লক্ষ টাকার একটি বড় ঘুষ বাণিজ্যের তথ্য আসে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে।

এ বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য জানতে সিন্ডিকেটের অন্যতম প্রধান সহযোগী কর কর্মকর্তা আব্দুল মজিদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে, তিনি আত্মপক্ষ সমর্থনের পরিবর্তে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। ‘দৈনিক পর্যবেক্ষণ’ পত্রিকার কার্যালয় কোথায় তা জানতে চেয়ে সরাসরি অফিসে চলে আসেন তিনি। সেখানে এসে বস্তুনিষ্ঠ ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করার চেষ্টায় গণমাধ্যম নীতি বহির্ভূত বিভ্রান্তিমূলক কথা বলেন এবং নানা রকম ভয়ভীতি ও শাসানি প্রদর্শন করেন।একটি জাতীয় পত্রিকার অফিসে এসে সরকারি কর্মকর্তার এভাবে প্রকাশ্য হুমকি ও শাসানি দেওয়ার ঘটনাকে সম্পূর্ণ বেআইনি, নজিরবিহীন ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি হস্তক্ষেপ বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী এবং সংবাদকর্মীরা।

‘খুঁটির জোর’ কোথায় মজিদের? নগরজুড়ে গুঞ্জন রয়েছে, কর কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল মজিদ চট্টগ্রামের সাবেক মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীর আমল থেকে চসিকে কর্মরত আছেন। দেশের রাজনৈতিক পটে এত বড় বড় উত্থান-পতন এবং নিজের বিরুদ্ধে হাজারো অনিয়মের অভিযোগ থাকার পরও তিনি কীভাবে এখনো কর্পোরেশনে বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, আব্দুল মজিদের সিন্ডিকেট প্রতি সপ্তাহে মাঠ পর্যায়ের কালেক্টরদের কাছ থেকে আপিল বিভাগের নাম করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়, যা পরবর্তীতে সরাসরি প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস.এম সরোয়ার কামালের নির্দিষ্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। মেয়র ও দুদকে জমা পড়া অভিযোগে চাঞ্চল্যকর ৮ তথ্য:ভুক্তভোগী মহলের পক্ষ থেকে চসিক মেয়র ও দুদকে দাখিল করা লিখিত অভিযোগে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা ও তার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে একাধিক সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে: ৬০ লক্ষ টাকার পদোন্নতি বাণিজ্য: কর কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ, মোঃ রাশেদ ও দবির আলম চৌধুরীকে মূল পদে স্থায়ী না করেই, নিয়মবহির্ভূতভাবে ‘টিও স্কেল’ পাইয়ে দেওয়ার নামে এককালীন ৬০ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সরোয়ার কামাল। আদেশ বাতিল ও টাকা আত্মসাৎ: রাজস্ব সার্কেল-০৭ এর কর আদায়কারী শাহাদাত আল মনছুরকে ‘ডিটিও’ বানানোর আশ্বাস দিয়ে কর কর্মকর্তা সালাউদ্দিনের মাধ্যমে ৪ লক্ষ টাকা ঘুষ নেন। পরবর্তীতে তীব্র আপত্তির মুখে সেই অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হলেও ঘুষের টাকা আর ফেরত দেননি। মিটিংয়ের নামে চাঁদা ও আপ্যায়ন লুট: প্রতি সপ্তাহে মিটিংয়ের নামে কর কর্মকর্তা, উপ-কর কর্মকর্তা ও লাইসেন্স ইন্সপেক্টরদের কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। মাসে ২২টি মিটিং কী উদ্দেশ্যে করা হয়, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অথচ এই মিটিংয়ের আপ্যায়নের খরচও অবৈধভাবে নেওয়া হয় চসিকের নেজারত শাখা থেকে।

স্ত্রীর কাপড়ের পার্সেল সিন্ডিকেট: সরোয়ার কামাল ঢাকা থেকে তার স্ত্রীর নামে বিভিন্ন কাপড়ের পার্সেল আনিয়ে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) আক্তারের মাধ্যমে কর কর্মকর্তাদের ওপর চাপিয়ে দেন। জোরপূর্বক এসব পার্সেলের বিপরীতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে বিল আদায় করা হয়। পিকনিকের নামে জুলুম ও উপহার গ্রহণ: প্রতি মাসে জোরপূর্বক ২-৩টি পিকনিকের আয়োজন করে চাঁদা বাণিজ্য করা হয়। কোনো কর্মকর্তা এতে রাজি না হলে তাকে শাস্তি হিসেবে প্রতিদিন সকাল-বিকাল প্রধান কার্যালয়ে এসে হাজিরা দিতে বাধ্য করা হয়। এছাড়া লালখান বাজারের ‘স্টাইল ফ্যাশন’ থেকে দামী ব্লেজার ও কোট ওনাকে উপহার দিতে বাধ্য করা হয়। সার্কেল ভিজিট বাণিজ্য: প্রতি মাসে একটি সার্কেলে কমপক্ষে ২ বার ‘ভিজিট’ করার নামে ৩০-৪০ হাজার টাকা করে চাঁদা আদায় করেন। টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রকাশ্য সভায় অপমান করা হয়। ব্যাংক জমায় কমিশন ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী উপহার: সরকারি ও বেসরকারি বড় বড় হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের চেকগুলো নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার পছন্দের ব্যাংকে জমা করা হয়। এর বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্যাংকগুলো থেকে তিনি মোটা অঙ্কের কমিশনসহ কম্পিউটার, এলইডি টিভির মতো দামী উপহার সামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেন। আতঙ্ক সৃষ্টি ও দালালি: কর্মচারীদের মধ্যে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সবসময় একটি আতঙ্কের পরিবেশ বজায় রাখা হয়, যাতে কেউ মুখ খুলতে না পারে। এই অপকর্মগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি সার্কেলে সুনির্দিষ্ট কিছু ‘দালাল’ নিযুক্ত রয়েছে।
সিসিটিভি ফুটেজে মিলবে প্রমাণ: অভিযোগে জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তার কার্যালয়ের সিসিটিভি ক্যামেরা ও তার আশেপাশের নথিপত্র সঠিকভাবে পর্যালোচনা ও তদন্ত করলে এই সিন্ডিকেটের প্রতিদিনের অবৈধ টাকা লেনদেনের অনেক গোপন ও অকাট্য প্রমাণ বেরিয়ে আসবে। জনগণের সেবার এবং আস্থা অর্জনের জায়গায় বসে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস.এম সরোয়ার কামাল ও তার সহযোগীরা যেভাবে প্রকাশ্য ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছেন, তাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এতসব গুরুতর অভিযোগের পরও তারা কীভাবে এখনো স্বপদে বহাল আছেন, তা নিয়ে সচেতন নগরবাসী ও চসিকের সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চসিককে দুর্নীতিমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী মহল।

অভিযুক্তদের বক্তব্য: এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস.এম সরোয়ার কামালের দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দেননি। অন্যদিকে কর কর্মকর্তা আব্দুল মজিদ তাঁর বিরুদ্ধে আনা পত্রিকা অফিসে গিয়ে শাসানি এবং দুর্নীতির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। চসিক সূত্রে জানা গেছে, মেয়র কার্যালয় ও দুদক বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

এই নিউজ ৬১৫ বার পড়া হয়েছে