নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট : বাংলাদেশের বাস্তবতায় যেকোনো প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে একই সঙ্গে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যাওয়াটাই নিয়ম। তবে এ ক্ষেত্রে অনন্য এক ব্যতিক্রম তৈরি করেছে সিলেট-চারখাই-শেওলা স্থলবন্দর চার লেন মহাসড়ক প্রকল্প। নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির আভাস থাকলেও, উল্টো পূর্ত কাজের ব্যয় কমেছে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে গত ২০ মে সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এই মেগা প্রকল্পের পূর্ত কাজের জন্য দুই হাজার ৫০৬ কোটি টাকা ব্যয়ের অনুমোদন দিয়েছে। প্রকল্পটির মূল অবকাঠামো উন্নয়নে আগে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল তিন হাজার ১০০ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলে ব্যাপক প্রতিযোগিতা হয়। তিনটি লটে মোট ৪৭টি দরপ্রস্তাব জমা পড়ে, যার মধ্যে ৩৯টি কারিগরিভাবে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির (টিইসি) সুপারিশে সর্বনিম্ন দরদাতাদের নির্বাচন করা হয়। সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ২০ শতাংশ ‘লেস’ (কম) ধরে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ে নতুন এই ব্যয় অনুমোদন করেছে। ব্যয় কমলেও প্রকল্পের মূল নকশায় বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। চূড়ান্তভাবে তিনটি পৃথক লটে তিনটি যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রথম লটে যৌথ উদ্যোগে মনিকো লিমিটেড (বাংলাদেশ) এবং চায়না রেলওয়ে নম্বর চার ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডকে এক হাজার ৯৯ কোটি ৫১ লাখ ৮৪ হাজার ৪২৬ টাকায় কাজ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় লটে চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে ৮১৬ কোটি ২৫ লাখ ৫১… ও আচ্ছা, ৮১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৫১ হাজার ৮৩০ টাকায় কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর তৃতীয় লটে যৌথ উদ্যোগে এনডিই (বাংলাদেশ) এবং আরবিসিজিকে (চীন) ৫৮৯ কোটি ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকায় কাজ দেওয়া হচ্ছে। ৪২ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কটি চার লেনে উন্নীত করার প্রকল্প ২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল একনেকে অনুমোদিত হয়, যার মেয়াদ ছিল ১ জানুয়ারি ২০২৩ থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত। তবে প্রকল্পের অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক উৎপল সামন্ত জানান, বিগত দুই বছরে নানা কারণে মাঠপর্যায়ের কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এই বিশাল অবকাঠামো নির্মাণ শেষ করা অসম্ভব। তাই প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। প্রকল্প ব্যবস্থাপক জাহিদ হাসান জানান, সিজিসির অনুমোদন ও মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র মিলেছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার আগে কিছু প্রশাসনিক কাজ থাকে। তবে মূল কাজ শুরু হওয়া নির্ভর করছে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার ওপর। তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, ব্যয় কমলেও নকশা একই আছে, শুধু গোলাপগঞ্জের পরে মহাসড়কের দুই পাশের সার্ভিস লেন বাদ দেওয়া হয়েছে।এই মেগা প্রকল্পের আওতায় ২৪৭ দশমিক ১৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ৪২ দশমিক ৮০ লাখ ঘনফুট মাটির কাজ এবং ৪২ দশমিক ৯৮৫ কিলোমিটার পেভমেন্ট নির্মাণ করা হবে। একই সাথে ১ হাজার ৫৭৫ জন মাস পরামর্শক সেবা, ৩১টি কালভার্ট, ৩টি সেতু, ৬টি ওভারপাস, ৫টি আন্ডারপাস, ৪টি ফুটওভার ব্রিজ, ৭টি পথচারী পারাপার এবং একটি টোল plaza নির্মাণ করা হবে। প্রায় ৪৩ কিলোমিটার চার লেনের এই মহাসড়কের উভয়পাশে ধীরগতির দুটি সার্ভিস লেনও থাকছে। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে গোলাপগঞ্জ পৌরশহরে ৬০০ মিটারের একটি ফ্লাইওভার, চারখাই ও হেতিমগঞ্জ বাজারে দুটি পৃথক ৩০০ মিটারের ফ্লাইওভার এবং রানাপিং ও রামধা বাজারে ৫০ থেকে ৬০ মিটারের দুটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে কুশিয়ারা নদীর বর্তমান শেওলা সেতুর কাছে চার লেনে একটি নতুন দৃষ্টিনন্দন সেতু নির্মাণ করা হবে।
আগস্টের আগেই ভূমি অধিগ্রহণ: জেলা প্রশাসক: ভূমি অধিগ্রহণের বিলম্ব নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, “সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের জায়গা অধিগ্রহণে আমাদের কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকায় এই প্রকল্পের কাজ কিছুটা পিছিয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আমাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়েছে। আশা করছি আগামী আগস্টের আগেই ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।”এই মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ হলে সিলেটের বিয়ানীবাজার, দক্ষিণ সুরমা, গোলাপগঞ্জ, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ এবং মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া উপজেলার যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। শেওলা স্থলবন্দরের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উপকৃত হবেন এই দুই অঞ্চলের লাখ লাখ সাধারণ মানুষ।