• সিলেট, রাত ৩:১৪, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের বনপাড়া কলেজে ৪ কোটির ‘ভুতুড়ে’ নিয়োগ কেলেঙ্কারি

admin
প্রকাশিত মে ১৯, ২০২৬
ময়মনসিংহ হালুয়াঘাটের বনপাড়া কলেজে ৪ কোটির ‘ভুতুড়ে’ নিয়োগ কেলেঙ্কারি

আব্দুল হালিম সাগর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন: একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কলেজ শাখার মোট শিক্ষার্থী মাত্র ৭০ জন। অথচ সেই কলেজ শাখায় সরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও কর্মচারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬ জনে! অর্থাৎ, শিক্ষার্থীর চেয়ে শিক্ষকের সংখ্যাই বেশি। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, শিক্ষা ব্যবস্থার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই ‘ভুতুড়ে’ কাণ্ডটি ঘটেছে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) এক সাম্প্রতিক ও চাঞ্চল্যকর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক ভয়াবহ নিয়োগ জালিয়াতি, ভুয়া সনদ ও ওপেন সিক্রেট স্বজনপ্রীতির চিত্র। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতায় বছরের পর বছর ধরে ‘ব্যাকডেট’ (পেছনের তারিখ) দেখিয়ে নিয়োগ, ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার এবং বিধিবহির্ভূত এমপিওভুক্তির মাধ্যমে সরকারি কোষাগার থেকে ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯১৭ টাকা বেতন-ভাতা হিসেবে লুটে নেওয়া হয়েছে। ডিআইএ-র মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম এই ঘটনাকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে ‘অনিয়মের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইতোমধ্যে মূল অভিযুক্ত সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হককে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে এবং তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সুপারিশসহ আত্মসাৎকৃত প্রায় ৪ কোটি টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

#“শিক্ষার্থী ৭০ জন শিক্ষক ৭৬ জন ”!  # ৭৬ শিক্ষকের ৭৩ জনের নিয়োগ জালিয়াতি # অধ্যক্ষ নিয়োগ দিয়েছেন নিজের স্ত্রী,ছেলে,মেয়েকে।

নিয়োগ বোর্ডে নিজেই মেম্বার সেক্রেটারি, প্রার্থী স্ত্রী-সন্তানেরা! অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক নিজেই নিয়োগ বোর্ডের সদস্যসচিবের দায়িত্বে থেকে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করেছেন। তিনি সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তার স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েকে চাকরি দিয়েছেন। তদন্তের সবচেয়ে নাটকীয় ও লজ্জাজনক অংশ ছিল অফিস সহায়ক পদের নিয়োগ পরীক্ষা। সেখানে একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিসেবে পরীক্ষা দিয়েছেন মা ও ছেলে! স্ত্রীর নিয়োগ জালিয়াতি: মোসা. ইসমেতারা ২০২১ সালের ২৬ অক্টোবর অফিস সহায়ক পদে যোগদান করেন (এমপিও ইনডেক্স নম্বর: এন৫৬৮১৩২৬৭)। তদন্তে দেখা যায়, তার অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকেই দেওয়া এবং সেই সনদে স্বাক্ষর রয়েছে খোদ তার স্বামী অধ্যক্ষ ইমদাদুল হকের। এই পদের নিয়োগ পরীক্ষায় মায়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন তার নিজের ছেলে ইমরুল হাসান কায়েস। পরীক্ষায় মাকে পাস করিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি ৫ লাখ ৬০ হাজার ৮১৫ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা তুলেছেন, যা এখন ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছেলের নিয়োগ জালিয়াতি: পরীক্ষায় মায়ের কাছে ‘হেরে’ যাওয়ার পর ছেলে ইমরুল হাসান কায়েসকে ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর ল্যাব সহকারী (আইসিটি) পদে নিয়োগ দেওয়া হয় (এমপিও ইনডেক্স নম্বর: এন৫৬৮৫৪২৭৬)। এই নিয়োগে মাউশি অধিদপ্তরের নির্ধারিত সরকারি প্রতিনিধি (আনন্দ মোহন বা মুমিনুন্নিছা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মনোনীত প্রতিনিধি) উপস্থিত ছিলেন না। নিয়মনীতি ভেঙে অন্য কলেজের অধ্যক্ষকে এনে এই নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। এমনকি তার কম্পিউটার বিষয়ে এসএসসি পাসের কোনো নম্বরপত্রও দেখাতে পারেনি তদন্ত দল। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তার নেওয়া ৩ লাখ ৭০ হাজার ৭৯৬ টাকা ফেরতযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। মেয়ের নিয়োগ জালিয়াতি: অধ্যক্ষের মেয়ে ইসরাত জাহান ২০২৩ সালের ১ অক্টোবর ল্যাব সহকারী (পদার্থবিজ্ঞান) পদে যোগদান করেন (এমপিও ইনডেক্স নম্বর: এন৫৬৮৭১৫৬৫)। তার নিয়োগেও কোনো সরকারি প্রতিনিধি ছিলেন না। তদুপরি, তার জন্মতারিখ নিয়ে নথিপত্রে চরম জালিয়াতি ধরা পড়েছে। চাকরির আবেদনে জন্মতারিখ ১৯ আগস্ট ২০০৫ উল্লেখ করা হলেও, তার এসএসসি সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ ১৯ আগস্ট ২০০৬। অর্থাৎ, চাকরি পাওয়ার সুবিধার্থে জন্মতারিখ জালিয়াতি করা হয়েছে। তার নেওয়া ৩ লাখ ৯ হাজার ৮৯৬ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অধ্যক্ষের নিজেরই ডাবল মাস্টার্স সনদ ভুয়া! ফেরত দিতে হবে ৪১ লাখ টাকা ডিআইএ-র তদন্তে থলের বেড়াল বেরিয়ে এসেছে খোদ সাবেক অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে। ২০০০ সালে নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেওয়া এই ব্যক্তির প্রারম্ভিক নিয়োগটিই ছিল অবৈধ। ২০০০ সালের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে চতুরতার সাথে বিএসসি ও বি.কম ডিগ্রিধারীদের বাদ দিয়ে শুধু বিএ ও বিএসএস-দের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, যা তৎকালীন এমপিও নীতিমালার পরিপন্থী। যোগদানের সময় তার কোনো বিএড সনদ বা প্রয়োজনীয় পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। পরে ২০০৭ সালে তিনি ‘শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি’ থেকে যে বিএড ডিগ্রি দেখান, সরকারি বিধি অনুযায়ী তা গ্রহণযোগ্যই নয়। সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ধরা পড়েছে তার স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সনদে: ১. এমপিওভুক্তির জন্য তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্সের একটি সনদ জমা দেন। ডিআইএ সেটি যাচাইয়ের জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠালে কর্তৃপক্ষ জানায়, সনদটি তখনই বৈধ হবে যদি ছাত্রের পিতার নাম ‘মো. আসির উদ্দিন’ ও মাতার নাম ‘আহমেদা খাতুন’ হয়। কিন্তু ইমদাদুল হকের মূল দাখিল, আলিম ও নিয়োগপত্রে পিতার নাম ‘মো. আজহার আলী’ এবং মাতার নাম ‘মমিরন নেছা’। অর্থাৎ, অন্য কারোর সনদ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
২. নিরীক্ষাকালে তিনি জালিয়াতি ঢাকতে ‘আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি’ থেকে ২০০৫ সালের অর্জিত আরেকটি মাস্টার্স সনদ দাখিল করেন। তবে ইউজিসির নিয়ম অনুযায়ী ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ সম্পূর্ণ অবৈধ। একই ব্যক্তির দুটি ভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুয়া মাস্টার্স সনদ দাখিলের এই জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় তার অধ্যক্ষ পদ ও এমপিওভুক্তি সম্পূর্ণ অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত অবৈধভাবে নেওয়া মোট ৪১ লাখ ২১ হাজার ২৬১ টাকা তাকে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১৯ শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ ও অর্থ ফেরত বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মোট ৭৬ জন শিক্ষকের মধ্যে ৭৩ জনের নিয়োগেই কোনো সরকারি বিধিমালা বা ফরমালিটি মানা হয়নি। এর মধ্যে সরাসরি ভুয়া রেকর্ড, ব্যাকডেট নিয়োগ ও জাল সনদের সাথে জড়িত ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে চূড়ান্তভাবে অযোগ্য ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। কাগজপত্র জালিয়াতি ও ব্যানবেইস তালিকায় নাম না থাকায় কলেজ শাখার ৮ জন প্রভাষককে প্রত্যককে ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন: সতানজিলা ইসলাম লিজা (বাংলা), মো. আবু রায়হান (ইংরেজি), মোস্তাফিজুর (আইসিটি), লুৎফা তালুকদার (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন (সমাজকর্ম), তৌহিদা বেগম (ইসলাম শিক্ষা), মো. শহীদুল আলম (ইসলামের ইতিহাস), মো. কামরুল ইসলাম (ফিন্যান্স) একই অপরাধে প্রভাষক মোছা. রেহেনা পারভীন, কামাল হোসেন এবং মো. নূরে আলমকেও ১২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ টাকা করে ফেরত দিতে হবে। এছাড়া প্রভাষক মো. হাসিবুর রহমানকে ৩৬ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮ টাকা, সহকারী শিক্ষক শামছুন নাহারকে ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৮ টাকা, নাসরীন সুলতানাকে ২৮ লাখ ৭১ হাজার ৭যবধফবৎ৪৮ টাকা, সহকারী শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানকে ৮ লাখ ৫ হাজার ১৯৪ টাকা, অফিস সহকারী মো. আমিনুল হককে ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৫২৬ টাকা এবং জাল সনদধারী প্রভাষক মো. শাহজাহান আলীকে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৮ টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
“শিক্ষা ইতিহাসের নিকৃষ্টতম উদাহরণ” ডিআইএর মহাপরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম এই অনুসন্ধানের বিষয়ে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন: “বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় যে ব্যাপক দুর্নীতি ও সীমাহীন অনিয়ম হয়েছে, বনপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এসব অবাস্তব ঘটনা ঘটেছে। ৭৬ জন শিক্ষককে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩ জনেরই কোনো নিয়ম মানা হয়নি। যেখানে শিক্ষার্থী মাত্র ৭০ জন, সেখানে শিক্ষক ৭৬ জন! বিষয়টিকে আমি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসের ‘অনিয়মের প্রকৃষ্টতম উদাহরণ’ হিসেবে মনে করছি।” সশিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসাৎ করা অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে একের পর এক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হবে।

এই নিউজ ১১২ বার পড়া হয়েছে