• সিলেট, সকাল ৮:৩৩, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

“কুমিল্লার এলজিইডি প্রকৌশলী একরামুল ও স্ত্রী শাম্মী” আলাদিনের চেরাগ পেয়ে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক

admin
প্রকাশিত মে ২৫, ২০২৬
“কুমিল্লার এলজিইডি প্রকৌশলী একরামুল ও স্ত্রী শাম্মী” আলাদিনের চেরাগ পেয়ে অর্ধশত কোটি টাকার মালিক

বিশেষ প্রতিবেদন :  কুমিল্লার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক উপসহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতো অবিশ্বাস্য সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। কুমিল্লা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে কর্মরত দশম গ্রেডের এই কর্মকর্তার নাম একরামুল হক। তার মাসিক মাত্র ৪৯ হাজার টাকা সর্বমোট বেতন পাওয়া এই সরকারি চাকুরিজীবী ও তার গৃহিণী স্ত্রী শাম্মী আক্তারের নামে অন্তত ৫০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের খোঁজ পেয়েছেন অনুসন্ধানকারীরা। সরকারি বেতন কাঠামোর সাথে বাস্তব সম্পদের এই বিশাল অসংগতির বিষয়টি সামনে আসায় ইতিমধ্যে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
নথিপত্রে জালিয়াতি ও কর ফাঁকির কৌশল অনুসন্ধানে জানা গেছে, একরামুল হকের মূল বাড়ি কুষ্টিয়ায় হলেও কৌশলগত কারণে তিনি তার আয়কর নথি জমা দিয়েছেন যশোর। অন্যদিকে, তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারের আয়কর ফাইল রয়েছে কুষ্টিয়ায়। তদন্তকারী ও অনুসন্ধানকারীদের সূত্রমতে, এই দম্পতির দাখিলকৃত আয়কর নথির ঘোষিত আয়ের সাথে তাদের বাস্তব সম্পদের আকাশ-পাতাল ব্যবধান রয়েছে। কর ফাঁকি এবং অবৈধ আয়ের উৎস লুকাতে অন্তত ৫০ কোটি টাকার সমপরিমাণ সম্পদ আয়কর নথিতে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছে বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গৃহিণী যখন কাগজ-কলমে ‘ব্যবসায়ী’আয়কর নথিতে শাম্মী আক্তারের পেশা হিসেবে “ব্যবসায়ী” উল্লেখ করা হলেও স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তিনি মূলত একজন পুরোদস্তুর গৃহিণী। তার আয়ের নিজস্ব কোনো বৈধ উৎস নেই। মূলত স্বামীর অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ বৈধ দেখানোর ঢাল হিসেবে তাকে ব্যবসায়ী সাজানো হয়েছে।
সম্পদের খতিয়ান: কোথায় কী আছে? অনুসন্ধানে একরামুল দম্পতির রাজধানী ঢাকা, কুষ্টিয়া সদর ও মিরপুর উপজেলায় বিপুল পরিমাণ জমি, বহুতল ভবন, ফ্ল্যাট এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে।
বিশেষ করে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ৩০ কোটির প্লট। ফ্লটটির অবস্থান ভাটারা মৌজা, ঢাকা। পরিমাণ: ৯ দশমিক ৯০ শতাংশ (প্রায় ১০ কাঠা) জমির একটি প্লট। খতিয়ান নম্বর: ১১৬৭৮। বর্তমান বাজারমূল্য: অন্তত ৩০ কোটি টাকা। সর্বশেষ অবস্থা: গত জানুয়ারি মাসে স্ত্রী শাম্মী আক্তার এই প্লটের নামজারির আবেদন করেছেন, যার নথিপত্র অনুসন্ধানকারীদের হস্তগত হয়েছে।
এছাড়া কুষ্টিয়া সদরে বহুতল ভবন ও ফ্ল্যাট রয়েছে। নিজ জেলা কুষ্টিয়া সদরেই এই দম্পতি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। মুন্সি পুকুরপাড় (চৌড়হাস-২২ মৌজা): ৪ দশমিক ৯১ শতাংশ জমির ওপর একটি দৃষ্টিনন্দন ছয়তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। জমি ও ভবনের বর্তমান মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা (খতিয়ান নং- ৬০)।
এছাড়া ঢাকা ঝালুপাড়া-২৭ মৌজা: ৪০৮/১ খতিয়ানে প্রায় ৬৬ শতাংশ জমি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। একই এলাকায় ফ্ল্যাটও রয়েছে। নিজের নামে একটি ফ্ল্যাট ও ১.১২৩ শতাংশ জমি, যার আনুমানিক মূল্য ৭৫ লাখ টাকা। স্ত্রীর নামে জমি: হাউশ হরিপুর-১৮ মৌজায় ১৪.৯৭৩ শতাংশ (মূল্য ৬০ লাখ টাকা) এবং হাউজহাটি-৫৩ মৌজায় ৪৪.১৬ শতাংশ জমি (মূল্য ৫০ লাখ টাকা)।
এছাড়া মিরপুরে পান বরজ, বাগান ও তামাক ক্ষেত কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলা জুড়ে একরামুল হক বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি কিনেছেন। ফতেপুর-২২ মৌজা (খতিয়ান ১৪০), ৫৫ শতাংশ জমি কিনে সেখানে করেছেন আধুনিক পান বরজ (মূল্য ৩০ লাখ টাকা)।  একই মৌজা (খতিয়ান ১১৭), ২৮.৫০ শতাংশ জমিতে তৈরি করেছেন বিশাল বাগান (মূল্য ৪০ লাখ টাকা)। পোড়াদহ ছালদহাটি বাজার, একটি দোতলা বাড়ি এবং ৪টি বাণিজ্যিক দোকান। ছালদহাটি-৫৩ মৌজা (কৃষিজমি), এই মৌজার ৬৯৫ খতিয়ানে তিনটি বড় বড় দাগে জমি কেনা হয়েছে, ১৯২.১৭ শতাংশ জমি (তামাক ক্ষেত) যার মূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। এছাড়া রয়েছে আরো ২২৫.১৭ শতাংশ জমি যার মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা। ২৫-২৫০ খতিয়ানে ২৯৭ শতাংশ (প্রায় ৯ বিঘা) জমি যার মূল্য প্রায় ৪ কোটি টাকা। অনুসন্ধান থেকে প্রাপ্ত ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় আরো ১০ কোটি টাকার নগদ অর্থ।
ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লাখ লাখ টাকা: স্থাবর সম্পদের পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকেও রয়েছে একরামুল দম্পতির বিপুল অর্থ। অনুসন্ধানে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকে একরামুলের একাধিক হিসাবের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে শাম্মী আক্তারের নামে রয়েছে ডাচ-বাংলা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ও অগ্রণী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট। এসব হিসাবে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকে প্রায় ৩ লাখ টাকা, সোনালী ব্যাংকে প্রায় ২০ লাখ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে প্রায় ৪৩ লাখ টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংকে প্রায় ২১ লাখ টাকা এবং অগ্রণী ব্যাংকে প্রায় ৪ লাখ টাকা জমা রয়েছে বলে জানা গেছে। দুদকের নজরদারিতে একরামুল দম্পতি: দুদকের একটি সূত্র জানিয়েছে, আয়কর নথিতে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের অসামঞ্জস্য পাওয়ায় একরামুল দম্পতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘নব্য ধনাঢ্য’ একজন সরকারি কর্মচারীর নামে ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে একরামুল হক বলেন, “আমার সামান্য কিছু সম্পত্তি আছে। বাকি যা আছে, তা আসলে আমার ভাইয়ের। ভুলক্রমে অনলাইন ডকুমেন্টে আমার নাম ব্যবহার করা হয়েছে।”

এই নিউজ ১১৪ বার পড়া হয়েছে