• সিলেট, সকাল ৮:৩৩, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

সিলেট সীমান্তে বারবার বিজিবি-বিএসএফ গোলাগুলি নেপথ্যে চোরাচালান? মামলা হয়না গডফাদারদের নামে!

admin
প্রকাশিত মে ২৫, ২০২৬
সিলেট সীমান্তে বারবার বিজিবি-বিএসএফ গোলাগুলি নেপথ্যে চোরাচালান? মামলা হয়না গডফাদারদের নামে!

আব্দুল হালিম সাগর সীমান্ত থেকে ফিরে:

# সীমান্তে বারবার বিজিবি-বিএসএফ গোলাগুলি। #নেপথ্যে কোটি টাকার চোরাচালান। # আড়ালে থাকে ‘লাইনম্যান’ সিন্ডিকেট? # বিজিবি, পুলিশ, নেতা সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে সিন্ডিকেট। # চোরাইপন্য আটক হলে আটক হয়না চোরাকারবারিরা। # লাইনম্যান নামের গড ফাদারদের নামে হয়না মামলা। # বিজিবি, থানা পুলিশ, জেলা ডিবির রয়েছে লাইনম্যান।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্তে গত ১৮ মে বিকেলে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এবং বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মধ্যে আকস্মিক ও তীব্র গুলি বিনিময়ের ঘটনায় গোটা সীমান্তজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। যদিও বিজিবির সিলেট ব্যাটালিয়নের (৪৮ বিজিবি) তাৎক্ষণিক ও কঠোর প্রতিরোধের মুখে বিএসএফ পিছু হটতে বাধ্য হয়। বর্তমানে সীমান্তে ‘হাই অ্যালার্ট’ বা সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থা জারি থাকায় পরিস্থিতি আপাত দৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও, ভেতরে ভেতরে ফুটছে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক। এই উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রশ্ন উঠেছে সীমান্তে এতো ঘন-ঘন গোলাগুলির আর লাশের দীর্ঘ মিছিলের আসল কারণ কী? এটি কি কেবলই সীমান্ত লঙ্ঘন? নাকি এর আড়ালে রয়েছে দু দেশের কোটি কোটি টাকার চোরাচালান বাণিজ্য ও দুই দেশের অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব?
মাঠ পর্যায়ের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং স্থানীয় সীমান্ত বাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত ১৮ মে’র গোলাগুলির তাৎক্ষণিক কারণ ছিল চোরাচালানের ৫টি ভারতীয় মোটরসাইকেলের একটি বড় চালান পারা পার এবং এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই দেশের অপরাধী চক্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। সোনারহাট এলাকার চিহ্নিত চোরাকারবারি শামসুদ্দিন কালা ওরফে ‘শ্যাম কালা’র নাম বারবার স্থানীয়দের মুখে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই শ্যামকালা চোরাচালানের বেপরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই প্রায়শই বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি এবং গুলি বিনিময়ের মতো ঘটনা ঘটে। যার খেসারত দিতে হয় সীমান্তের নিরীহ সাধারণ মানুষকে। গত ১৮ মে রাতে শ্যামকালা সিন্ডিকেটের সদস্যরা ভারত থেকে ৫টি চোরাই মটর সাইকেল বর্ডার ক্রস করে দেশে নিয়ে আসে। প্রথমে ৪টি মটর সাইকেল নিরাপদে দেশে নিয়ে আসতে পারলেও একটি মটর সাইকেলের আরোহী ভুল করে কাঁদায় পড়ে যায়। সে সময় মটর সাইকেলটি টানা হেচড়ার সময়ে নজর পড়ে টহলরত বিএসএফ সদস্যদের। তারা সেখানে হাজির হয়ে চোরাকারবারিদের প্রতিহত করতে চায়। এ সময় কালা সিন্ডিকেটের সদস্যরা বিএসএফ সদস্যদের লক্ষ্য করে কয়েকটি ইট-পাটকেল ছুঁড়ে মারে। বিএসএফ এর সদস্যরা পিছু হটে তখন গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। সে সময় নয়াগাঁও এলাকায় টহল দিচ্ছিলো বাংলাদেশের বিজিবির সদস্যরা। তারা গুলির শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে গেলে তারাও পাল্টা গুলি ছুড়ে আকাশের দিকে। ফলে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষের মাঝে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। সুযোগ বুঝে মটরসাইকেলটি দেশের ভিতরে নিয়ে চলে আসে কালার লোকজন। কিন্তু চোরাকারবারিদের সাথে সংশ্লিষ্টতা থাকায় সেখানকার বিজিবির সদস্যরা প্রকৃত ঘটনাটি আড়াল করে রাখেন শুধু শ্যাম কালাকে রক্ষা করতে। অনেকে সোমবার বিকেলে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ)-এর মধ্যে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত গোলাগুলির ঘটনার নেপথ্য নায়ক হিসেবে স্থানীয় চোরাচালানের গডফাদার শামসুদ্দিন কালা ওরফে ‘শ্যাম কালা’কে দায়ি করেন। স্থানীয় একাধিক বাসিন্ধা জানান, সোমবার বিকেলে সোনারহাট সীমান্ত দিয়ে শ্যাম কালার একটি চক্র ভারতীয় চোরাই মোটরসাইকেল বাংলাদেশে আনার চেষ্টা করছিল। এ সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী (বিএসএফ) তাদের বাধা দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে শ্যাম কালার সশস্ত্র লাঠিয়াল বাহিনী উল্টো বিএসএফ সদস্যদের ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিএসএফ গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে, দেশের মানুষের জানমাল রক্ষা এবং আত্মরক্ষার্থে বিজিবি সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালায়। দুই দেশের সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর এই সংঘর্ষের মূলহোতা শ্যাম কালা হলেও সে এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শ্যাম কালা শুধু একজন চোরাকারবারীই নয়, বরং সিলেট জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও স্থানীয় থানার কয়েকজন কর্মকর্তার বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জনের মূল কারিগর।
সিলেট জেলা ডিবির সাবেক ওসি রেফায়েত ও ইকবালকে কোটিপতি বানানোর পেছনে মূল ভূমিকা ছিল এই শ্যাম কালার। এছাড়া গোয়াইনঘাট থানার সাবেক ওসি রফিকুল ইসলামের শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জনের পেছনেও তার সিন্ডিকেটের হাত ছিল বলে গুঞ্জন রয়েছে।
সাবেক কর্মকর্তাদের বিদায়ের পর বর্তমান জেলা ডিবির দুই ওসি আনোয়ার ও আশরাফ এবং গোয়াইনঘাট থানার বর্তমান ওসিও একই পথে হাঁটছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ওসিদের মতো দ্রুত বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার আশায় তারা শ্যাম কালাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরোক্ষ ছত্রছায়ায় শ্যাম কালা সীমান্তে তার সাম্রাজ্য আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সীমান্তে কোটি টাকার পণ্য জব্দ করা হলেও চোরাকারবারিরা কিন্তু ‘অধরা’ থাকে কেন?
এদিকে বিজিবির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, চোরাচালান প্রতিরোধে তারা অত্যন্ত কঠোর। যার প্রমাণ হিসেবে গত ১৬ ও ১৮ মে সিলেট সীমান্তের সোনালীচেলা, বাংলাবাজার, সংগ্রাম, প্রতাপপুর, কালাসাদেক ও পান্থুমাই এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে প্রায় ৩ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ভারতীয় জিরা, চিনি, কসমেটিকস, কম্বল, ওষুধ ও মদ জব্দ করা হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারের সময় বিপুল পরিমাণ চা-পাতার চালানও আটক করা হয়। কিন্তু এই বিশাল সফলতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে বড় রহস্য। প্রতিটি অভিযানে কোটি কোটি টাকার মালপত্র আটক হলেও কোনো চোরাকারবারিকে আটক করতে পারেনি বিজিবি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এটি মূলত একটি “লোক দেখানো” প্রক্রিয়া। নাম প্রকাশ না করার শর্তে গোয়াইনঘাটের একাধিক বাসিন্দা জানান, “চোরাই মাল আটক হলে বিজিবির খাতায় নাম ওঠে, কিন্তু চোরাকারবারিদের আটক করা হয় না। কারণ তাদের সাথে আগে থেকেই ‘লাইনম্যান’দের মাধ্যমে বখরার চুক্তি থাকে। মাল ধরা পড়ার অর্থ হলো হয় ওই চালানের বখরা সময় মতো পৌঁছায়নি, অথবা উপরের মহলকে দেখানোর জন্য সাধারণ ব্যবসায়ীদের বলির পাঁঠা বানানো হয়।”
চোরাচালানের ‘লাইনম্যান’ ও ‘লাইনের ঘাট’ কালচার: ওসির নামে টাকা তোলার অভিযোগ: সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য নিরাপদে পার করার জন্য প্রতি মাসে ‘লাইনের ঘাট’ বা নির্দিষ্ট পয়েন্ট মাসিক চুক্তিতে বিক্রি হয়। চলতি মে (২০২৬) মাসেও গোয়াইনঘাট সীমান্তের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাট প্রায় অর্ধকোটি টাকায় অপরাধী চক্রের কাছে “ইজারা” দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করে তথাকথিত ‘লাইনম্যান’ বা গডফাদাররা, যারা সবসময় আড়ালে থাকে। স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, স্থানীয় গোয়াইনঘাট থানার ওসির (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) নাম ভাঙিয়ে দিনরাত একদল লাইনম্যান নিয়মিত “লাইনের টাকা” বা মাসোহারা তুলছে। ওসি নিজে এই বিষয়টি জানেন কি না, কিংবা প্রশাসনের কতটুকু মৌন সম্মতি এখানে রয়েছে তা নিয়ে এলাকায় তীব্র গুঞ্জন রয়েছে।
বিজিবির যোগ-সাজস লাইন কালচার: পুলিশের মতো সীমান্ত এলাকার প্রতিটি বিজিবির ক্যাম্পের কামান্ডারদের রয়েছে নিজস্ব লাইনম্যান। তারা বিজিবি নামে টাকা তোলেন। সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য নিরাপদে পার করার জন্য প্রতি মাসে তারাও ‘লাইনের ঘাট’ বা নির্দিষ্ট পয়েন্ট সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তিতে বিক্রি করে থাকেন। চলতি মে (২০২৬) মাসেও ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গোয়াইনঘাট সীমান্তের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাট প্রায় ৪০ লাখ টাকায় অপরাধী চক্রের কাছে “ইজারা” দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সোনারহাট বিজিবি ক্যাম্পের লাইনের ইজারাদার সামছুদ্দিন উরফে শ্যামকালা।
প্রতাপুর বিজিবি ক্যাম্পের লাইনের ইজারাদার হলেন, খায়রুল, কামরুল ও তোফায়েল আহমদ। রাধানগর বাজার, লামাপুঞ্জি, চা বাগান, হাজিপুর, লুনি এলাকার পুলিশ ও ডিবির লাইনম্যান হচ্ছেন আব্দুল্লাহ, আল আমিন, রিয়াজ, আরিফ, কালাম।
সংগ্রাম বিজিবি ক্যাম্পের লাইনের ইজারাদার ডালিম ও থানার পুলিশ ও ডিবির লাইনম্যান আব্দুল মান্নান উরফে মান্নান মেম্বার ও আব্দুল হান্নান। উপজেলার অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র জাফলং অপরাধ ও চোরাচালানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদে বালি লুটপাট, ভারতীয় পণ্যের মহোৎসব এবং আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকের ভয়াবহ কারবার চলছে। এই সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন স্থানীয় ৩নং পূর্ব জাফলং ইউপি সদস্য আব্দুল মন্নান (মন্নান মেম্বার) এবং তার সহযোগী, বিজিবির লাইনম্যান ডালিম। অভিযোগ উঠেছে, এই সিন্ডিকেট ভারত থেকে অবৈধভাবে অস্ত্র নিয়ে আসছে এবং তা নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও লীগের ক্যাডারদের কাছে সরবরাহ করছে। দিনদুপুরেই পুলিশের চেকপোস্টের সামনে দিয়ে ডিআই ট্রাক ভর্তি ভারতীয় মহিষ এবং শত শত নাম্বারবিহীন মোটরসাইকেলে পাচার হচ্ছে জিরা, কসমেটিকস ও কম্বল। ১৫-১৭ বছরের কিশোরদের দিয়ে চালানো এসব মোটরসাইকেলে অন্তত ৫ বস্তা করে জিরা বহন করা হচ্ছে। চালকরা জানান, প্রতি ট্রিপে এক হাজার টাকার বিনিময়ে তারা পণ্যগুলো রাধানগরের গুদামে পৌঁছে দেন। বাধা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করলে চালকরা সরাসরি বলেন, “মন্নান মেম্বার ও ডালিম সবকিছু ম্যানেজ করেন, পুলিশ, বিজিবি ও ডিবি—কাউকেই আমাদের ভয় নেই।”বিজিবির কথিত লাইনম্যান ডালিম সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে দাম্ভিকতার সাথে বলেন, “আপনারা ঝামেলা করলেন কেন, আমি আর মন্নান মেম্বার এই লাইন চালাই। টাকা-পয়সা দিয়ে সেটেল্ড করি। সংবাদ প্রকাশ করে আমাদের কিছুই করা যাবে না।”
সূত্রমতে, সংগ্রাম ক্যাম্পের পাশে পাবলিক টয়লেট মার্কেটের আশপাশের প্রায় ৫০টি গুদামে এবং রাধানগর কাফাউড়া, ইসলামপুর ও আলমনগর বাজারের গুদামগুলোতে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় কসমেটিকস, জিরা ও ওষুধ মজুদ করে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কসমেটিকস ও জিরার আড়ালে এই সিন্ডিকেট আগ্নেয়াস্ত্রও পাচার করছে। তামাবলি স্থলবন্দর ও সোনাটিলা, নলজুরি আমসপ্ন বিজিবি ও পুলিশের লাইনম্যান হলেন, সাদ্দাম, ইরন, জয়দুল নিয়েছেন ভাগ করে।
জেলা ডিবির ওসির নামে টাকা তোলার অভিযোগ: সীমান্ত দিয়ে অবৈধ পণ্য নিরাপদে পার করার জন্য প্রতি মাসে ‘লাইনের ঘাট’ বা নির্দিষ্ট পয়েন্ট সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তিতে বিক্রি হয়। গোয়াইনঘাট সীমান্তের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটে
জেলা ডিবির ওসিরা নিয়োগ দিয়েছেন নিজস্ব লাইনম্যান। এই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করে তথাকথিত ‘লাইনম্যান’ বা গডফাদাররা, যারা সবসময় আড়ালে থাকে। স্থানীয়দের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ডিবির ওসির কয়েকজন লাইনম্যান নিয়মিত “লাইনের টাকা” বা মাসোহারা তুলছেন।
পবিত্র ঈদকে সামনে রেখে ভারতীয় গরুর হাট ও চোরাচালান সিন্ডিকেট:
আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে সীমান্ত জুড়ে ভারতীয় গরু ও মহিষের অবৈধ অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে। সোনারহাট, জাফলং ও জৈন্তাপুর সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে হাজার হাজার ভারতীয় পশু বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চোরাই গরুর বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে একটি সুনির্দিষ্ট সিন্ডিকেট।
বিছনাকান্দিতে ‘বুঙ্গাড়ী গোলাম’ সিন্ডিকেটের অঘোষিত সাম্রাজ্য:
বিছনাকান্দি ও হাদারপাড় এলাকায় স্থানীয় থানার ওসির নাম ভাঙিয়ে ভারতীয় গরু-মহিষের বিশাল হাট বসিয়েছেন গোলাম হোসেন ওরফে “বুঙ্গাড়ী গোলাম”। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা সিন্ডিকেটটি বগাইয়া, মনেরতল ও দমদমিয়া সীমান্ত পয়েন্ট ব্যবহার করে কয়েকশ কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিমাসে। সাবেক আওয়ামীলীগ নেতা বর্তমানে তিনি নিজেকে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরীর ‘ঘনিষ্ঠ’ দাবি করে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করছেন। তবে উপদেষ্টা দপ্তর থেকে পরিষ্কার জানানো হয়েছে, এসব অপরাধীর সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। এই সিন্ডিকেটে জড়িত রয়েছেন বিছনাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও হাদারপাড় বাজারের ইজারাদার জালাল আহমদ ও কয়েস আহমদ। তাদের গরু এখ যাচ্ছে তোয়াকুল ও পিরেরবাজার ও রাধানগর বাজারে। প্রতিটি ভারতীয় গরু ও মহিষ থেকে ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা হারে চাঁদা আদায় করছে তার বাহিনী। পশুর পালের আড়ালে এই রুট দিয়ে অবাধে আসছে মাদক। বিছনাকান্দি সীমান্ত দিয়ে আসা এসব অবৈধ পণ্য গোয়াইনঘাট-সালুটিকর সড়ক হয়ে একদিকে এয়ারপোর্ট এলাকা এবং অন্যদিকে জালালাবাদ রোড দিয়ে নির্বিঘ্নে প্রবেশ করছে সিলেট নগরীতে। এই বিশাল চোরাচালান প্রক্রিয়ার ‘ম্যানেজমেন্ট’ বা সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করে নুরু ও নজরুল সরাসরি ভূমিকা পালন করছেন তাকে সহযোগীতা করছে সালুটিকর ফাঁড়ির এএসআই সরোওয়ার।
জাফলংয়ের আরেক ত্রাসের নাম ‘কালা মানিক’: চোরাচালান বাণিজ্যের পাশাপাশি জাফলং সীমান্তের ব্রিজের নিচে চলছে আরেক ভয়ঙ্কর অবৈধ কর্মকাণ্ড। সেখানে পরিবেশ আইন সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে প্রতি রাতে লাখ লাখ টাকার বালু উত্তোলন করছে কালা মানিক নামের এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও তার চক্র। স্থানীয়দের দাবি, কালা মানিক এতটাই প্রভাবশালী যে তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা প্রশাসনকেও তোয়াক্কা করেন না। প্রতি রাতে বালুভর্তি ট্রাক থেকে পুলিশ ও কালা মানিক চক্রের যৌথ পকেটে যাচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ফলে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও জাফলংয়ের পরিবেশ ও নদীর তলদেশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। চোরাচালানে সহায়তার কারণে গোয়াইনঘাট থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ফারুকুল ইসলাম সজিবকে ক্লোজড করা হয়েছে। রাত হলেই সীমান্ত দিয়ে ঢুকছে ফেন্সিডিল, ইয়াবা এবং বিদেশি মদ, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা ভারতীয় শাড়ি, লেহেঙ্গা এবং নামী-দামী ব্র্যান্ডের নকল কসমেটিকসে সয়লাব হয়ে গেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি।
‘সাদা সোনা’ ও বিপন্ন জননিরাপত্তা:
বর্তমানে সিলেট সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি আসছে ভারতীয় চিনি, যা স্থানীয়ভাবে এখন ‘সাদা সোনা’ নামে পরিচিত। জৈন্তাপুরের ডিবি বিল এবং কানাইঘাটের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা দিয়ে রাতের আঁধারে শত শত বস্তা চিনি দেশে ঢুকছে এবং বস্তা বদলে দেশি কোম্পানির সিল লাগিয়ে তা বাজারে ছাড়া হচ্ছে। আর দেশ থেকে ভারতে হচ্ছে মানব পাচার। সম্প্রতি জেলার জৈন্তাপুর থানার পুলিশ গোপন সংবাদে ১৪ জন রোহিঙ্গাকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। তারা সকলেই ছিলো জৈন্তাপুরের শীর্ষ চোরাকারবারি আব্দুল করিম উরফে বেন্ডিজ করিম ও জনৈক হানিফের বাসায়। করিম ভারতে অবস্থান করলে গত মঙ্গলবার স্থানীয় লোকজন হানিফকে আটক করে পুলিশে দিয়েছে।
এদিকে সিলেটের নবাগত ডিআইজি জিল্লুর রহমান বলেছেন, সকল ধরণের অপরাধের ক্ষেত্রে তিনি ‘জিরো টলারেন্স’ ভুমিকায় দেখতে চান তার পুলিশ সদস্যদের।
সিলেট রেঞ্জ ডিআইজি যা বলেন, সম্প্রতি সিলেট রেঞ্জের দায়িত্ব গ্রহণ করেই এমন হুমিয়ারি দেন ড. মো. জিল্লুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সিলেট অঞ্চলে মাদক, অস্ত্র এবং চোরাচালান প্রতিরোধে “জিরো টলারেন্স” নীতি ঘোষণা করেছেন। তাঁর কঠোর নির্দেশনায় সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলায় বিশেষ চেকপোস্ট ও ধারাবাহিক অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে বলে তার দপ্তর নিশ্চিত করেছে। “ঈদকে সামনে রেখে চোরাচালান রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে জেলা পুলিশ। নবনিযুক্ত ডিআইজির নির্দেশনায় গত ১১ মে থেকে জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
জেলা পুলিশ সুপার যা বলেন, কড়া নজরদারি সত্ত্বেও স্থানীয় ফাঁড়ি ও থানার কিছু অসাধু কর্মকর্তার কারণে চোরাচালান সিন্ডিকেট এখনো বহাল তবিয়তে তাদের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। সিলেট ৪৮ সেক্টরের বিজিবি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং বর্ষা মৌসুমে নদীবাহিত পথগুলো ব্যবহারের কারণে নজরদারি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে, তবুও তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্তে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনতে এবং বিএসএফের গুলির মুখে নিরীহ বাংলাদেশিদের মৃত্যু বন্ধ করতে হলে শুধু পণ্য বা পশুই জব্দ করা যথেষ্ট নয়, বরং আড়ালে থাকা গডফাদার, লাইনম্যান, এবং শ্যাম কালা, বুঙ্গাড়ী গোলাম, নুরু, নজরুল, মন্নান মেম্বার, ডালিম ও কালা মানিকের মতো সিন্ডিকেট প্রধানদের আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সাথে প্রশাসনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কালো ভেড়াদের চিহ্নিত করে উপড়ে ফেলাই এখন সময়ের দাবি।

এই নিউজ ১০৪ বার পড়া হয়েছে