বিশেষ প্রতিনিধি : জুলাই বিপ্লবের পর সারা দেশে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানোর দাবি করা হলেও সিলেট জেলায় উল্টো চিত্র দেখা গেছে। সরকারি কোষাগারে রাজস্ব জমার পরিবর্তে ‘ভুয়া রশীদ’ তৈরি করে পরিবহণ খাত থেকে দৈনিক লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা ট্রাফিক পুলিশের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। আর এই পুরো চাঁদাবাজি চক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাফিক ইন্সপেক্টর (টিআই) শাহাব উদ্দিন আহমদ, যার পেছনে জেলা পুলিশ সুপারের (এসপি) পরোক্ষ আশ্রয় রয়েছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট জেলায় কর্মরত ১৮ জন সার্জেন্ট ও টিএসআই-কে দৈনিক ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের ‘টার্গেট’ বেঁধে দিয়েছেন টিআই শাহাব উদ্দিন। মামলার ভয় ও হয়রানির মুখে ফেলে জেলার বিভিন্ন পরিবহণ থেকে দৈনিক গড়ে ১ লাখ থেকে ১.৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অবৈধভাবে আদায় করা হচ্ছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি ছিল, ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর তা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়। ট্রাফিক সেক্টরে হাতের লেখার পরিবর্তে অনলাইন মামলার বিধান চালু হলেও সিলেট জেলা ট্রাফিক পুলিশ সেই নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে। সূত্রমতে, জেলা ট্রাফিক পুলিশ নিজেরাই একটি জরিমানার বুক (রশীদ বই) তৈরি করে তা সার্জেন্টদের সরবরাহ করেছে। দিনশেষে কোন সার্জেন্ট ভুয়া রশীদের মাধ্যমে কত টাকা কালেকশন করলেন, সেই হিসাব হোয়াটসঅ্যাপ (ডযধঃংঅঢ়ঢ়)-এর মাধ্যমে টিআই শাহাব উদ্দিনকে পাঠাতে হয়। কালেকশন কম হলে সংশ্লিষ্ট সার্জেন্টদের তিরস্কারের শিকার হতে হয়। এমনকি প্রতিদিন সকালে টিআই-এর ‘মুন্সি’ (সহকারী) মেসেজ পাঠিয়ে সার্জেন্টদের টার্গেটের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এই কালেকশন তদারকির জন্য সার্জেন্টদের পেছনে নিজস্ব লোকও লেলিয়ে রেখেছেন টিআই। অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সিলেট জেলায় পদায়নের আগে বর্তমান পুলিশ সুপার (এসপি) ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক ছিলেন গাজীপুরের এসপি। সেই সময় টিআই শাহাব উদ্দিন ও তার অনুগত দলবলও গাজীপুরে কর্মরত ছিলেন। এসপি সিলেটে বদলি হয়ে আসার পরপরই এই চক্রটিকে নিজের অধীনে সিলেটে নিয়ে আসেন। এরপর থেকেই সিলেটে শুরু হয় ‘গাজীপুর মডেল’-এর হরিলুট। অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি: মাস শেষে এই খাত থেকে আদায়কৃত টাকার প্রায় অর্ধেক (আনুমানিক ২০ লক্ষ টাকা) পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেকের হাতে সরাসরি পৌঁছে দেন টিআই শাহাব উদ্দিন। সিলেটের একাধিক পরিবহণ শ্রমিক সমিতির নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জেলার ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে শুরু করে জকিগঞ্জ পর্যন্ত প্রতিটি সড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে গাড়ি আটকে চাঁদা নিচ্ছেন সার্জেন্টরা। কাগজপত্র সঠিক থাকার পরও নানা অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সার্জেন্ট জানান, তারা চাকরি বাঁচানোর তাগিদে এই অবৈধ কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু সার্জেন্টরাই নন, কালেকশন বাড়াতে টিআই শাহাব উদ্দিন তার বিশ্বস্ত সহযোগী সার্জেন্ট দিনার আলী মুন্সীকে নিয়ে নিজে বিভিন্ন উপজেলা শহরে অভিযানে নামেন। গত ৯ জুন জকিগঞ্জে কোনো প্রকার সরকারি মামলা না দিয়ে, যানবাহন আটকে রেখে ৮৫ হাজার টাকা নগদ আদায় করে গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো: যাবের সাদেক নিজের সম্পৃক্ততা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন: “৫ আগস্টের পর সিলেটে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা বন্ধ ছিল। আমি যোগদানের পর তা আবার চালু করেছি। অনলাইনের পরিবর্তে হাতে লিখে ভুয়া রশীদ দিয়ে টাকা তোলার বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” এদিকে বিষয়টি নিয়ে কথা বললে সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি ড. জিল্লুর রহমান জানান, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তে সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।