• সিলেট, সন্ধ্যা ৭:৫৭, ৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বাজেট কৌশল ও জনতুষ্টির দোলাচল, এনবিআরের পিছুটান কি যৌক্তিক?

admin
প্রকাশিত জুন ৬, ২০২৬
বাজেট কৌশল ও জনতুষ্টির দোলাচল, এনবিআরের পিছুটান কি যৌক্তিক?

সম্পাদকীয় : আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কিছু সাহসী ও সংস্কারমুখী পদক্ষেপ থেকে শেষ মুহূর্তে সরে আসার খবরটি দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকাশ। রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং করের আওতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সম্পদ কর আরোপ, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর অগ্রিম আয়কর ধার্য এবং আবাসন খাতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা ছিল তুঙ্গে। কিন্তু জনতুষ্টির রাজনীতি, সামাজিক মাধ্যমের সমালোচনা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে সরকার শেষ মুহূর্তে এই পরিকল্পনাগুলো থেকে পিছু হটেছে। রাজস্ব ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও আইএমএফের রাজস্ব বাড়ানোর শর্তের এই সংকটাপন্ন সময়ে করজাল সম্প্রসারণের এই পিছুটান দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে কতটা টেকসই করবে, তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

বাজেটের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত রেখে পরবর্তী ধাপগুলোতে প্রগতিশীল হারে সম্পদ কর আরোপের একটি যৌক্তিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আহরণ। কিন্তু সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে এতে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি। তাত্ত্বিকভাবে সম্পদ কর বৈষম্য কমাতে সাহায্য করলেও এর ব্যবহারিক প্রয়োগে বড় ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকি রয়েছে। বাংলাদেশে যেহেতু প্রকৃত বাজারমূল্যে সম্পদ মূল্যায়ন করার নিখুঁত পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি, তাই রিটার্নে ঘোষিত মূল্যের ওপর কর ধার্য করা হলে কর ফাঁকির প্রবণতা যেমন বাড়ত, তেমনি বিত্তশালীদের মধ্যে পুঁজি পাচারের আশঙ্কাও তৈরি হতো। উচ্চ প্রশাসনিক ব্যয় এবং হতাশাজনক রাজস্ব আয়ের কারণে বিশ্বের অনেক দেশই এই কর ব্যবস্থা থেকে সরে এসেছে। তবে সম্পদ কর এখনই আরোপ না করলেও করদাতারা যেন সম্পদ লুকাতে না পারেন, সেই প্রযুক্তিগত ও আইনি কাঠামো প্রস্তুত করা জরুরি, কারণ সম্পদ সঠিকভাবে প্রদর্শিত হলে আয় লুকানো কঠিন হবে এবং পরোক্ষভাবে কর ফাঁকি কমে আসবে।

অন্যদিকে, ১১০ সিসির ওপরের মোটরসাইকেলের ওপর কর আরোপের খবরে রাইড-শেয়ারিং চালকদের বিক্ষোভ ও সামাজিক মাধ্যমের সমালোচনার মুখে সরকার যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে, তা সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচের দিক থেকে সাময়িক স্বস্তিদায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে করজাল সম্প্রসারণের নীতিকে বাধাগ্রস্ত করবে। তবে জীবনযাত্রার বাহন হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সিসি পর্যন্ত অব্যাহতি রেখে ১৬৫ সিসির বেশি ইঞ্জিন ক্ষমতার বিলাসবহুল মোটরসাইকেল মালিকদের ক্ষেত্রে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। একই সাথে, দেশের সড়ক ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি করা দ্রুত বর্ধনশীল ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর বার্ষিক এক থেকে পাঁচ হাজার টাকা অগ্রিম আয়করের প্রস্তাবটি ছিল স্থানীয় পর্যায়ে করের পরিধি বাড়ানোর একটি চমৎকার সুযোগ। সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ভিত্তিক এই কর কাঠামোটি বাস্তবায়ন করা গেলে একটি বড় অনুৎপাদিত খাত করের আওতায় আসত। আমাদের দেশে সংস্কারের দাবি তুলে আবার কর আরোপের সময় বিরোধিতা করার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।

তবে এবারের বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে আবাসন বা জমি কেনাবেচায় কালো টাকা বা অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ না রাখার বিষয়টি। বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতা বলে, বিশেষ সুবিধা দিয়ে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ সাময়িকভাবে সামান্য কিছু রাজস্ব আনলেও তা দীর্ঘমেয়াদে সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং সমাজে কর সংস্কৃতির মারাত্মক ক্ষতি করার পাশাপাশি দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। তাই এই ক্ষতিকর সুযোগ বন্ধ রাখাই দেশের অর্থনীতির জন্য উত্তম।

পরিশেষে বলা যায়, এনবিআরকে কর আদায়ের ক্ষেত্রে সাময়িক জনতুষ্টি বা শর্টকাট পথ পরিহার করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। সম্পদ করের মতো বড় সংস্কার হুট করে চাপিয়ে না দিয়ে করদাতাদের আগে থেকেই আগাম বার্তা বা ডেডলাইন দেওয়া উচিত, যাতে তারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারেন। একই সাথে কর প্রশাসনকে আধুনিক ও শতভাগ ডিজিটালাইজড করতে হবে যাতে কর ফাঁকি বন্ধ হয়। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের ওপর করের বোঝা চাপানো যাবে না, অন্যদিকে বিত্তশালী ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে করের আওতার বাইরে রাখাও সমীচীন হবে না; সরকারের নীতিতে এই সুষম ভারসাম্য রক্ষা করাটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ফিরোজ আহম্মেদ মোল্লা, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ।

এই নিউজ ১০ বার পড়া হয়েছে