• সিলেট, সকাল ৮:০৬, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

বগুড়ায় চিকিৎসার নামে ‘মৃত্যুফাঁদ’

admin
প্রকাশিত জুন ৭, ২০২৬
বগুড়ায় চিকিৎসার নামে ‘মৃত্যুফাঁদ’

বগুড়া প্রতিনিধি: বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে অলিগলি—সবখানেই এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। চিকিৎসাসেবার মহান ব্রত ছাপিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান এখন হয়ে উঠেছে চরম অনিয়ম, প্রতারণা আর গলাকাটা বাণিজ্যের নিরাপদ আখড়া। প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর ধরে মানহীন এসব প্রতিষ্ঠান রমরমা ব্যবসা চালিয়ে গেলেও কার্যকর তদারকির অভাবে সাধারণ রোগীদের জীবন এখন চরম ঝুঁকিতে। ভুল চিকিৎসা আর অবহেলায় এখানে প্রতিনিয়ত ঝরছে তাজা প্রাণ, তবুও থামছে না এই পৈশাচিক ‘চিকিৎসা বাণিজ্য’।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক পিলে চমকানো চিত্র। শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথা থেকে কলোনি মোড় পর্যন্ত মাত্র আড়াই কিলোমিটার এলাকায় গড়ে উঠেছে প্রায় ৭০টি চিকিৎসাকেন্দ্র। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় কানুছগাড়ী মোড় থেকে ঠনঠনিয়া বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার এলাকায়, যেখানে রাস্তার দুই পাশে ঠাসাঠাসি করে অবস্থান করছে ৪২টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের নথিতে জেলায় ৪৮৮টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও বাস্তবে এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেশি। অসংখ্য অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠান জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের অগোচরেই তাদের মরণঘাতী কারবার চালিয়ে যাচ্ছে।

বগুড়ার এসব ক্লিনিকে লাশের মিছিল এখন নিত্যদিনের ঘটনা। গত ২ জুন সারা ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে টনসিল অপারেশনের জন্য অ্যানেস্থেশিয়া করার পর শাপলা আক্তার নামে এক তরুণীর আর জ্ঞান ফেরেনি। এর মাত্র দুই দিন আগে সৃষ্টি জেনারেল হাসপাতালে দুই মাসের শিশু আবদুল্লাহ আল আয়ানের মৃত্যু হয় কর্তব্যরত নার্সদের চরম অবহেলায়। মৃত্যুর পর স্বজনদের সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে হাসপাতালের এক স্টাফের মন্তব্য ছিল— ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন’। এছাড়া প্রসূতি অহনা, এসএসসি পরীক্ষার্থী সিয়াম এবং অন্তঃসত্ত্বা রোকসানার মতো অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে এই শহরের বিভিন্ন ক্লিনিকে, যাদের সবার স্বজনদেরই অভিন্ন অভিযোগ ছিল ভুল চিকিৎসা ও অ্যানেস্থেশিয়ার অপপ্রয়োগ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ক্লিনিকে নিবন্ধিত এমবিবিএস চিকিৎসক ও ডিপ্লোমাধারী নার্স থাকা বাধ্যতামূলক হলেও বগুড়ার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। অনেক ক্ষেত্রে বড় বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নাম সাইনবোর্ডে ব্যবহার করা হলেও বাস্তবে চিকিৎসা দিচ্ছে ডিপ্লোমাধারী বা অপ্রশিক্ষিত ভুয়া কর্মীরা। নার্সের ইউনিফর্ম পরিয়ে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে সাধারণ কর্মীদের। এমনকি অপারেশন থিয়েটারে অত্যন্ত সংবেদনশীল নারকোটিকস ড্রাগ ব্যবহারের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের। তবুও বুক ফুলিয়ে তারা চালিয়ে যাচ্ছে জটিল সব অস্ত্রোপচার। অনেক ক্লিনিকে একই পরীক্ষার ভিন্ন ভিন্ন রিপোর্ট দিয়ে রোগীদের বিভ্রান্ত করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

বগুড়ার সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীদের মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও জনস্বাস্থ্যের জন্য এক ভয়াবহ হুমকি। রক্তমাখা সিরিঞ্জ, ব্যান্ডেজ ও ধারালো বর্জ্য সরাসরি পৌরসভার সাধারণ ডাস্টবিনে ফেলা হচ্ছে, যা নদী-নালা ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। বাংলাদেশ বেসরকারি ক্লিনিক মালিক সমিতির নেতারাও এই নৈরাজ্যের কথা স্বীকার করে জানিয়েছেন, নামমাত্র জরিমানা করে প্রশাসন দায় সারছে বলেই অবৈধ ক্লিনিকগুলো বারবার চালু হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অনেক হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে প্রয়োজনীয় ওষুধের লাইসেন্স পর্যন্ত নেই।

সার্বিক বিষয়ে বগুড়ার সিভিল সার্জন ডা. খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, লোকবল সংকটের কারণে নিয়মিত প্রতিটি অলিগলিতে তদারকি করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কোনো অবৈধ প্রতিষ্ঠানের তথ্য পেলেই তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, চিকিৎসাসেবার মতো স্পর্শকাতর খাতে এমন পৈশাচিক জালিয়াতি রুখতে কেবল জরিমানা বা সাময়িক স্থগিতাদেশ কি যথেষ্ট? আর কত প্রাণ গেলে টনক নড়বে প্রশাসনের? সাধারণ মানুষের প্রাণের সুরক্ষা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

এই নিউজ ১৭ বার পড়া হয়েছে