প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ৬, ২০২৬, ৪:৪৩ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ২, ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ণ
বকেয়া খাজনার জাল বুনে অসিমের কোটি টাকা বাণিজ্যের ফাঁদ: বড়লেখায় ডিসিসহ ৫ দপ্তরে গণঅভিযোগ, তদন্তে নামছে প্রশাসন

# টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া কাঁপানো ভূমি দস্যুতার নতুন খতিয়ান। #বকেয়া খাজনার জাল বুনে কোটি টাকা বাণিজ্যের ফাঁদ!
আব্দুল হালিম সাগর, মৌলভীবাজার থেকে ফিরে: ডিজিটাল ভূমি সেবাকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করার এক ভয়াবহ দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য গড়ে তুলেছেন মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ (দক্ষিণ) ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত তহসিলদার (উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা) আশীষ কুমার সরকার। খাজনা আদায়ে জালিয়াতি ও নামজারিতে ‘টেবিল মানি’ বাণিজ্যের পাশাপাশি সরকারের ভ্রাম্যমাণ আদালতের গোপন তথ্য অপরাধী সিন্ডিকেটের কাছে ফাঁস করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এই লুটপাটের হাত থেকে বাঁচতে ও প্রতিকার চেয়ে এলাকার অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক (ডিসি) বরাবর একটি যৌথ গণঅভিযোগ দাখিল করেছেন। দুর্নীতির এই খতিয়ানের অনুলিপি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, স্থানীয় সংসদ সদস্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সমন্বিত হবিগঞ্জ জেলা উপ-পরিচালক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে ও লিখিত অভিযোগে জানা যায়, ২০২৪ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এলাকার প্রবাসী ও অর্ধশিক্ষিত সাধারণ ভূমি মালিকদের টার্গেট করেন আশীষ কুমার সরকার। ভূমি মালিকেরা জমি ভোগদখলের নিয়মিত খাজনার বৈধ রসিদ নিয়ে অফিসে গেলেও সেগুলোকে সোজা ভুয়া বা জাল বলে দাবি করেন তিনি। এরপর সুকৌশলে ১৩৭৯ বঙ্গাব্দ থেকে বকেয়া দেখিয়ে অনলাইনে বিশাল অঙ্কের টাকা এন্ট্রি করে দেন। ২০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকার এই ভুতুড়ে হিসাব দেখে যখন সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে, তখনই শুরু হয় পর্দার আড়ালের সমঝোতা ও দর কষাকষি। ভুক্তভোগী মতিলাল দাস জানান, তার জমি সংক্রান্ত খাজনা পরিশোধ করতে গেলে তহসিলদার আশীষ প্রথমে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৩ ৯০ টাকা বকেয়া দেখান। পরবর্তীতে দরাদরি শেষে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়, যার বিনিময়ে মাত্র ৫০ হাজার টাকার অফিশিয়াল রসিদ দেওয়ার প্রস্তাব দেন ওই কর্মকর্তা। অন্যথায় রসিদ বাতিল, সার্টিফিকেট মামলা ও জমি খাস খতিয়ানে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। একই কায়দায় ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পকেটে পুরে মাত্র ১১২ টাকার অনলাইন রসিদ দেওয়ার ভুরিভুরি প্রমাণ মিলেছে, যা তার ইউজার আইডি ও নোটিশ জারির কপি যাচাই করলেই সত্যতা মিলবে।
ভূমি সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়াকেও এই কর্মকর্তা বাণিজ্যের হাতিয়ার বানিয়েছেন। আবেদনকারীদের অফিসে ডেকে নিয়ে জমির সীমানা, তফসিল, হিস্যা কিংবা মোহরির ভুল—এমন কাল্পনিক ও অযৌক্তিক ত্রুটি দেখিয়ে আবেদন পরিবর্তনের ভয় দেখানো হয়। নির্দিষ্ট অঙ্কের টেবিল মানি বা ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পকেটে গেলেই তৎক্ষণাৎ প্রতিবেদন অনুকূলে চলে যায়, অন্যথায় ত্রুটির অজুহাতে আবেদন বাতিলের সুপারিশ করে সাধারণ মানুষকে মাসের পর মাস ঘোরানো হয়। ভূমি সংক্রান্ত হয়রানির পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষিজমি ধ্বংস করে উর্বর উপরিভাগের মাটি কেটে ইটভাটায় বিক্রির সিন্ডিকেটের সাথেও এই কর্মকর্তার গভীর সখ্যতার অভিযোগ উঠেছে। ভারী ট্রাক-ট্রাক্টর চলাচলের কারণে গ্রামীণ সড়ক ধ্বংসের মুখে পড়লেও তিনি মাসোহারা বা আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে নীরব থাকেন। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, স্থানীয় প্রশাসন যখনই অবৈধ মাটি কাটার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার প্রস্তুতি নেয়, আশীষ কুমার সরকার অগ্রিম সেই গোপন তথ্য বা টিপস মাটি খেকো সিন্ডিকেটের কাছে ফাঁস করে দেন। ফলে এসিল্যান্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই অপরাধীরা সটকে পড়ে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাকে সরেজমিন তদন্তের নির্দেশ দিলে তিনি কোনো গাড়ি বা মাটি কাটার স্পট পাননি বলে মিথ্যা প্রতিবেদন জমা দিয়ে সিন্ডিকেটকে সুরক্ষা দেন বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ।
অভিযোগে আরও জানা যায়, আশীষ কুমার সরকার অফিসে বসে প্রভাবশালীদের ভয় দেখাতে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি ও সেক্রেটারি পরিবেষ্টিত হয়ে দম্ভোক্তি করতেন। তিনি নিজে ছাত্রজীবনে কলেজ ছাত্রলীগের সেক্রেটারি ছিলেন উল্লেখ করে ক্ষমতার দাপট দেখাতেন, যার কারণে সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খুলতে পারতো না। এর আগে উপজেলা ভূমি অফিসে অভিযোগ দেওয়া হলেও সেখানে থাকা তার সহযোগীরা অভিযোগের নথিপত্র গায়েব করে ফেলায় এসিল্যান্ড এতকাল কিছুই জানতে পারেননি। এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণভাগ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভারপ্রাপ্ত তহসিলদার আশীষ কুমার সরকার সম্পূর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থন করে ধমকের সুরে বলেন, এসব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একটি মহল তাকে হেনস্তা করার জন্য এই ধরনের ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে, প্রমাণ থাকলে যে কেউ নিউজ করতে পারেন। অন্যদিকে মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদুজ্জামান পাভেল বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগের অনুলিপি তারা পেয়েছেন এবং ঈদের ছুটি শেষে অফিস খোলার পর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বড়লেখার সুজানগর ও দক্ষিণভাগ এলাকার মতিলাল দাস, মো. কুরেশীয়া, রহিম বক্ত মুসা, মুরাদ হোসাইনের মতো অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগী এখন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে প্রহর গুনছেন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com
Copyright © 2026 Daily Porzobekkhon | দৈনিক পর্যবেক্ষণ. All rights reserved.