
সিলেট প্রতিনিধি : সিলেট নগরের কিন ব্রিজ এলাকায় সাদা পোশাকে দায়িত্ব পালনকালে র্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্যকে (২৬) ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনায় আতংকের নগরীতে পরিণত হয়েছে পুরো মহানগরী। হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের বিশেষ যৌথ অভিযানে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত সন্দেহে আড়াই শতাধিক জনকে আটক করা হয়েছে। মহানগরের ছয়টি থানা, বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়ি ও গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক টিম শুক্রবার থেকে শুরু করে গতকাল শনিবার এ রির্পোট লেখা পর্যন্ত শনিবার সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, অপরাধীদের আশ্রয়স্থল, মাদক স্পট এবং কিশোর গ্যাংয়ের আস্তানা লক্ষ্য করে এই বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ইমন আচার্য হত্যাকাণ্ডের পর পরই পুরো সিলেট মহানগরীকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। মহানগরের বিভিন্ন এলাকা থেকে ৬৭ জনকে আটক করা হয়। পরে সাঁড়াশি অভিযানের গতি বাড়িয়ে আরও ১৬৬ জনকে আটক করা হয়। এখন পর্যন্ত আড়াই শতাধিক ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ী, চুর, হাইজ্যাকারকে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ। এসএমপি জানিয়েছে, ঢালাওভাবে নয় বরং সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। আটককৃতদের মধ্যে তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী ও কিশোর গ্যাং সদস্য। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চোরাচালানকারী এবং জুয়াড়ি। বিভিন্ন নিয়মিত মামলার পরোয়ানাভুক্ত (ওয়ারেন্ট) আসামি। ট্রাফিক বিভাগের কড়াকড়ি: অভিযানের সমান্তরালে মহানগরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক বিভাগও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে তল্লাশি চৌকি বসিয়ে আইন অমান্যকারী ও সন্দেহভাজন ১০০টি যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
যেভাবে রক্তাক্ত হলেন র্যাব সদস্য ইমন: শুক্রবার (২২ মে) দুপুরে সিলেট নগরের ব্যস্ততম কিন ব্রিজ এলাকায় মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করছিল পুলিশ। সে সময় সাদা পোশাকে থাকা র্যাব-৯ এর সদস্য ইমন আচার্য পুলিশকে সহায়তা করতে এগিয়ে যান। ঘটনাস্থলে আসাদুল আলম বাপ্পী নামের এক ছিনতাইকারীকে জাপটে ধরে আটক করার চেষ্টা করেন ইমন। এ সময় তাদের মধ্যে তীব্র ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে বাপ্পী তার কাছে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে ইমনের বুকে ও পেটে উপর্যুপরি আঘাত করে। রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইমন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে তাৎক্ষণিক সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শিশু জিম্মির চেষ্টা ও মূল ঘাতক আটক হত্যাকাণ্ডের পর পালিয়ে যাওয়ার সময় মূল অভিযুক্ত আসাদুল আলম বাপ্পী তোপখানা এলাকার একটি আবাসিক বাড়িতে ঢুকে পড়ে। সেখানে নিজেকে বাঁচাতে এক শিশুকে জিম্মি করার চেষ্টা করে সে। তবে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ দল দ্রুত বাড়িটি ঘেরাও করে শিশুটিকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে এবং বাপ্পীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বাপ্পীর কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডেব ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিটি উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল শনিবার ঘাতক বাপ্পিকে আদালতে তোলা হয়েছে, এবং পুলিশ রিমান্ড আাবেদন করে।
তিন মাসের মাথায় ভাঙল সংসার: হাটহাজারীতে শোকের মাতম নিহত ইমন আচার্য চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার ধলই ইউনিয়নের আশ্চর্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। মাত্র তিন মাস আগে তিনি পারিবারিকভাবে বিয়ে করেছিলেন। বিয়ের রেশ কাটতে না কাটতেই ইমনের এমন নৃশংস মৃত্যুতে তার পরিবার ও নিজ গ্রামে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চট্টগ্রামের ধলই ইউনিয়নের বাতাস। সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া শেষ করে ইমনের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, মহানগরে অপরাধ ও অপরাধীদের সম্পূর্ণ নির্মূল না করা পর্যন্ত এই বিশেষ চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।
সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম বলেন, নিহত র্যাব সদস্য ইমনের বাড়ি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পশ্চিম ধলই গ্রামে। তাঁকে হত্যার ঘটনায় থানায় মামলা হবে। এ ঘটনায় আটক হওয়া আসাদুল আলমের বাসা নগরের কাজিরবাজার মোগলটুলা এলাকায়। তিনি একজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী। অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলাও হয়েছে। এদিকে শনিবার (২৩ মে) ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরে নিহতের স্বজনরা মরদেহ নিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন বলে জানিয়েছেন র্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার (অতিরিক্ত পুলিশ সুপার) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ। এ ঘটনায় নিহত ইমন আচার্যের ভাই সুজিত আচার্য বাদী হয়ে একজনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার প্রধান আসামি সিলেট নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন কাজিরবাজার মোগলটুলা এলাকার আবুল হোসেনের ছেলে আসাদুল আলম বাপ্পি (২২)। এমনটি জানিয়েছেন কোতয়ালী থানার ওসি ময়নুল জাকির।
সিলেটে দুর্ধর্ষ অপরাধী বাপ্পী: সিলেটের অপরাধ জগতের হোতা আসাদুল আলম বাপ্পী কিশোর বয়স থেকেই পা বাড়ায় অপরাধ জগতে। একাধিকবার জেল খাটেলও জামিনে বেরিয়ে সেই পুরোনো পথে হাটে বাপ্পী। একই সাথে নগরীতে মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইয়ের সিন্ডিকেট গড়ে তুলে। পুলিশের তালিকাভুক্ত অপরাধী হলেও সে ছিলো অত্যান্ত কৌশলী। পুলিশের ধরপাকড় থেকে বাঁচতে সে থাকতো সবসময় আত্মগোপনে। সিন্ডিকেট থেকে সিগন্যাল পেলেই নেমে পড়ত অপরাধ জগতে। বাপ্পী কোতোয়ালী থানার কাজিরবাজার এলাকার মোগলটুলার আবুল হোসেনের ছেলে। গ্রেফতারকৃত বাপ্পীর বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ও ছিনতাইসহ ৪টি মামলা রয়েছে। পুলিশ জানায়, শুক্রবার দুপুরে কোতোয়ালি থানা লাগোয়া কয়েকজন ছিনতাইকারী ও মাদকসেবী বসে মাদক সেবন করার সময় পুলিশের একটি দল তাদের ধাওয়া করে। পুলিশের তাড়া খেয়ে মাদকসেবীরা দৌড়ে পালাতে শুরু করলে ওই এলাকায় সাদা পোশাকে থাকা র্যাব সদস্য ইমন আচার্য পুলিশকে সহযোগিতা করতে এগিয়ে যান। তিনি ছিনতাইকারী আসাদুল আলম বাপ্পীকে জাপটে ধরেন। দুজনের তীব্র ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বাপ্পী ধারালো ছুরি দিয়ে ইমনের বুকের বাম পাশে আঘাত করে। রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় ইমনকে উদ্ধার করে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিসিইউ-২) চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, র্যাব সদস্যকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যাওয়ার সময় ঘাতক বাপ্পী তোপখানার একটি বাসায় ঢুকে পড়ে। বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসাবে সে এক শিশুর গলায় ছুরি ধরে পরিবারকে জিম্মি করার চেষ্টা চালায়। পরবর্তীতে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ দল অত্যন্ত নিখুঁত ও কৌশলী অভিযান চালিয়ে জিম্মি শিশুর প্রাণ রক্ষা করে। পরে ঘটনাস্থল থেকেই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরিসহ আসাদুল আলম বাপ্পীকে পুলিশ গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com