
আব্দুল হালিম সাগর : আসন্ন কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে চোরাচালানের হার আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়েছে। শুধু মসলাই নয়, স্বর্ণ, মাদক, চিনি থেকে শুরু করে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র পর্যন্ত সীমান্ত দিয়ে অবাধে দেশে ঢুকছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। ২০২৬ সালের প্রথম কয়েক মাসের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তে চোরাচালান বিরোধী অভিযান ব্যাপক জোরদার করা হয়েছে। শুধু ২০২৬ এর এপ্রিল মাসেই বিজিবি সারাদেশে ১৮৩ কোটি ২০ লাখ টাকার চোরাচালান পণ্য ও মাদক জব্দ করেছে। জানুয়ারি মাসে জব্দ করা হয়েছিল ১৩১ কোটি ৯৭ লাখ টাকার পণ্য। জব্দকৃত পণ্যের তালিকায় রয়েছে ৩ কেজি ৭১৩ গ্রাম স্বর্ণ, ১৫৫ গ্রাম ডায়মন্ড, ৫৯ হাজার ৩৫ কেজি জিরা, ১৯ হাজার ৭৫৪ কেজি চিনি, এবং ৮৪ হাজার ২৫৫ প্যাকেট বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী। এছাড়াও কসমেটিকস, শাড়ি ও তৈরি পোশাকের বড় বড় চালান ধরা পড়েছে।আইনশৃংখলাবাহিনী যততৎপর হয়ে উঠেছে চোরাকারবারিরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশাদার ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। তারা চোরাচালানের প্রধান রুট হিসাবে সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর সীমান্ত এখন চোরাচালানের প্রধান করিডোর হিসেবে ব্যবহৃত করছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে বর্তমানে যেসমস্ত পণ্য সবচেয়ে বেশি চোরাচালান হয়ে আসছে, সেগুলোকে কয়েকটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। মূলত শুল্ক ফাঁকি দেওয়া এবং ওপারে দাম কম হওয়ার কারণেই এই অবৈধ বাণিজ্য চলছে। বর্তমানে এই খাতের পণ্যগুলোই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে: সিলেট ও কুমিল্লা সীমান্ত দিয়ে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চিনি অবৈধভাবে আসছে। একে স্থানীয়ভাবে ‘সাদা সোনা’ বলা হচ্ছে। এলাচ, চিকন জিরা, লবঙ্গ, দারুচিনি এবং গোলমরিচ। বিশেষ করে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে এর প্রবণতা বেড়েছে। টেকনাফ ও সিলেট সীমান্ত দিয়ে বড় বড় সুপারির চালান অবৈধভাবে ঢুকছে। পেঁয়াজ ও রসুন যখন দেশে এসব পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন ভারত থেকে বস্তাভরে অবৈধভাবে এগুলো আনা হয়।মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য: ফেন্সিডিল, ভারতের সীমান্ত সংলগ্ন ল্যাবগুলোতে তৈরি এই সিরাপটি প্রতিনিয়ত পাচার হয়ে আসছে। ইয়াবা ও হেরোইন, যদিও ইয়াবা মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বেশি আসে, তবে ভারতের সীমান্ত দিয়েও এর বড় চালান ধরা পড়ছে।বিদেশি মদ ও বিয়ার,উত্তরবঙ্গ ও সিলেট সীমান্ত দিয়ে ক্যান ও বোতলজাত মদ পাচার হয়। গাঁজা,বিশেষ করে কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া সীমান্ত দিয়ে গাঁজার বড় বড় চালান দেশে ঢোকে। বিলাসদ্রব্য ও কসমেটিকস: কসমেটিকস, নামী ব্র্যান্ডের ফেসওয়াস, ক্রিম, শ্যাম্পু এবং সাবান (অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো নকল বা নিম্নমানের)। পোশাক, ভারতীয় শাড়ি, লেহেঙ্গা, থ্রি-পিস এবং তৈরি পোশাক। ঈদ বা পূজার সময় এর পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। জুয়েলারি, ইমিটেশনের গয়না এবং গোল্ড বা স্বর্ণের বার (স্বর্ণ সাধারণত পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হয়)। গবাদি পশু ও চামড়া, গরু ও মহিষ, কোরবানির আগে সীমান্ত দিয়ে গরু ও মহিষের অবৈধ অনুপ্রবেশ বেড়ে যায়।চামড়া, বাংলাদেশ থেকে পশুর চামড়া অনেক সময় ভারতে পাচার হয়ে যায়, আবার সেখান থেকেও প্রক্রিয়াজাত চামড়া অবৈধভাবে আসে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম: জীবন রক্ষাকারী ওষুধ, অনেক সময় ক্যানসারের ওষুধ বা জটিল রোগের ইনজেকশন অবৈধভাবে আনা হয়, যেগুলোর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত না থাকায় কার্যকারিতা হারায়। নিষিদ্ধ যৌন উত্তেজক বড়ি,ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে এগুলো প্রচুর পরিমাণে দেশে ঢোকে। মোবাইল হ্যান্ডসেট ও ইলেকট্রনিক্স: শুল্ক ফাঁকি দিয়ে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের মোবাইল ও ছোটখাটো ইলেকট্রনিক্স গ্যাজেট। অস্ত্র ও গোলাবারুদ, ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বা ককটেল তৈরির সরঞ্জাম যা অপরাধমূলক কাজে ব্যবহৃত হয়। ঘাসভর্তি বস্তা, বালু ভর্তি ট্রাকের নিচের ভারতীয় পন্য, বাইসাইকেল, এমনকি মাছের কার্টনে করে পণ্য পাচার করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক এক অভিযানে চট্রগ্রাম বন্দরে ডি-ক্যালসিয়াম ফসফেটের ড্রামে করে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ঔষধ (অ্যান্টিবায়োটিক) আমদানির সময় ধরা পড়ে। কেবল ব্যবসায়িক পণ্য নয়, দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ মাদক ও অস্ত্র চোরাচালানও বেড়েছে। গত এপ্রিল মাসে ২৩ লাখ ১৩ হাজার পিস ইয়াবা, ৭ হাজার বোতলের বেশি বিদেশি মদ এবং ১ হাজার ১৪৯ কেজি গাঁজা জব্দ করা হয়েছে। মাদক পাচার রোধে মে ২০২৬-এ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। গত মাসে ৬টি বিদেশি পিস্তল, ১ হাজার ৭২৫ রাউন্ড গুলি, ৮টি মাইন এবং ১টি মর্টার শেল উদ্ধার করা হয়েছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ঝুঁকি।
এদিকে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চোরাই পথে আসা মসলায় সয়লাব দেশের হাট-বাজার। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সীমান্ত দিয়ে অবাধে মসলা ঢুকছে বাংলাদেশে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন বৈধ পথে আমদানিকারক ব্যবসায়ীরা। সরকার হারাচ্ছে রাজস্ব। চোরাই পথে আসা মসলা কম দামে বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানি করা মসলা বাজার হারাচ্ছে। তবে ভোক্তাদের সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বলছে, চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি থাকায় বাজারে মসলার দাম কমছে। চোরাই পথে মসলা আগেও বাংলাদেশের বাজারে আসতো। মাংসসহ বিভিন্ন রান্নার উপকরণ উপাদেয় করতে মরিচ, হলুদ, ধনিয়ার মতো সাধারণ মসলার পাশাপাশি ব্যবহৃত চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচসহ নানান মসলাকে গরম মসলা হিসেবে ধরা হয়। বছরের অন্য সময়ের তুলনায় কোরবানিতে গরম মসলার চাহিদা থাকে বেশি। মসলা ব্যবসায়ীরা জানান, দেশে মোট চাহিদার গরম মসলার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। চিকন জিরা, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, গোলমরিচ- এ পাঁচ ধরনের গরম মসলা বেশি ব্যবহৃত হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরিমাণে কম হলেও সাধারণভাবে ব্যবহৃত মসলার মধ্যে এলাচের দাম সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি এলাচ আমদানি হয় গুয়েতেমালা থেকে। স্থলবন্দরগুলো দিয়ে ভারত থেকেও ব্যবহৃত এলাচের একটি অংশ বাংলাদেশে আসে। দেশের সীমান্তগুলো দিয়ে প্রতিদিন অবৈধভাবে মসলা দেশে ঢুকছে। বিশেষ করে সিলেট, কুমিল্লা, ফেনী এলাকার সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, কিশমিশ, কাজুসহ সব ধরনের মসলা ঢুকছে। এতে দেশের সর্ববৃহত খাতুনগঞ্জে মসলা বেচাকেনা বন্ধ হয়ে গেছে। জিরা কেজিতে ২২০-২৫০ টাকা শুল্ক, এলাচে কেজিপ্রতি ৫৫০-৬০০ টাকা শুল্ক হারাচ্ছে সরকার। বৈধ আমদানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বাংলাদেশে চায়না ও ভিয়েতনাম থেকে দারুচিনি আমদানি হয়। আগের বছরগুলোতে ইন্দোনেশিয়া ও মাদাগাস্কার থেকে আমদানি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকেও কিছু লবঙ্গ আমদানি হচ্ছে। ভিয়েতনাম থেকে গোলমরিচ আমদানি হয়। তবে চলতি বছর ভারত থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর হয়ে অল্প গোলমরিচ এসেছে। সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হওয়া গরম মসলার মধ্যে চিকন জিরার বেশিরভাগ আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে। পাশাপাশি আফগানিস্তান, চায়না থেকেও সামান্য পরিমাণে চিকন জিরা আমদানি হয়। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ভারত থেকে চোরাই পথে সীমান্ত দিয়ে জিরা, এলাচ, লবঙ্গ, কিশমিশ, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন ধরনের মসলাজাতীয় পণ্য বাংলাদেশে আসছে। নানান কৌশলে এসব পণ্য নিয়ে আসছে চোরাকারবারিরা। অভিযোগ রয়েছে, খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার মৌলভীবাজারের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী চোরাকারবারির সঙ্গে জড়িত। ব্যবসায়ীরা বলেন, ‘সীমান্ত দিয়ে চোরাই পথে জিরা, এলাচ ঢুকছে। বিশেষ করে ডিউটি দিয়ে আমদানি করা জিরা কস্টিং হচ্ছে কেজি ৫৩০ টাকা, সেই জিরা কিছু সিন্ডিকেট বিক্রি করছে কেজি ৫শ টাকা। আবার এলাচ ডিউটি দিয়ে এলে (আমদানি হলে) প্রতি কেজি কস্টিং হচ্ছে ৪১০০-৪২০০ টাকা। যারা চোরাই পথে আনছে, তারা ওই এলাচ বিক্রি করছে কেজি ৪০০০-৪০৫০ টাকায়। প্রতি কেজি ২শ টাকা কমে বিক্রি করছে অনেকে। এতে বৈধ আমদানিকারকরা মার খাচ্ছে।’ রাষ্ট্রীয় ভোগ্যপণ্য বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বাজারগুলোতে পাইকারিতে বর্তমানে জিরা বিক্রি হচ্ছে ৫৬০ থেকে ৬৮০ টাকায়। এক মাস আগেও এসব জিরা বিক্রি হয়েছিল ৫৭০ থেকে ৫৮০ টাকায়। বাজারে পাইকারিতে দারুচিনি বিক্রি হচ্ছে ৩৭০-৪০০ টাকা কেজিতে। গত মাসে এসব দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ৩৭০-৪৫০ টাকা। একইভাবে লবঙ্গ বিক্রি হচ্ছে ১২০০-১৩২০ টাকায়। গত মাসে এসব দারুচিনি বিক্রি হয়েছিল ১২৭০-১২৮০ টাকায়। একইভাবে বাজারে পাইকারিতে এবার এলাচ বিক্রি হচ্ছে ৪০০০-৪৮০০ টাকায়। এক মাস আগেও দর একই ছিল। পাইকারিতে গোলমরিচ বিক্রি হচ্ছে ১০২০-১০৬০ টাকায়। গত মাসে এসব গোলমরিচ বিক্রি হয়েছিল ১০৭০-১১৫০ টাকায়। শুধু গরম মসলা নয় দেশের বাজারে এখন অনাসেই প্রবেশ করছে ভারতীয় চোরাই পন্য। এসব বন্ধ করতে প্রশাসন বারবার ব্যর্থ হচ্ছে বলে সচেতন মহল মনে করেন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com