
# নেপথ্যে সোনা চোরাচালানের ভুল সোর্স । # ওসির ভোলবদল, কমিশনারের দায় স্বীকার। # চট্টগ্রামজুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড়। # ওসির বিরুদ্ধে হাজারো অভিযোগ।
বিশেষ প্রতিবেদন : চট্টগ্রামে জাতীয় দলের অফস্পিনার নাঈম হাসানকে ডিবি পরিচয়ে নির্মমভাবে মারধর ও হেনস্তার ঘটনায় এক চাঞ্চল্যকর নেপথ্য কাহিনী বেরিয়ে এসেছে। মাঠের ক্রিকেট খেলে ঢাকা থেকে নিজ শহর চট্টগ্রামে ফেরা এই তারকা ক্রিকেটার মূলত বিমানবন্দরকেন্দ্রিক সোনা চোরাচালানের একটি ভুল তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশের হিংস্র আচরণের শিকার হন। পরিচয় দেওয়ার পরও খুলশী থানার ওসির নির্দেশে তাকে থানায় নিয়ে গিয়ে চরম অপমান করা হয়, তবে ওসির মোবাইলে আসা একটি রহস্যময় ফোনেই মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বিমানবন্দর রুট দিয়ে সোনা পাচারের একটি গোপন সংবাদ আসে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের কাছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার রাতে লালখান বাজার ফ্লাইওভারের মুখে একটি বিশেষ তল্লাশি চৌকি বসায় খুলশী থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম, কনস্টেবল রাসেল এবং পুলিশের এক বিশেষ সোর্স। বিমানবন্দর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা যোগে বাসায় ফেরার পথে ঠিক এই চেকপোস্টেই আটকানো হয় ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে। পুলিশের সোর্স ও সদস্যরা ধারণা করেছিলেন, নাঈম কোনো চোরাকারবারি এবং তিনি নিজের পরিচয় নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। ঘটনাস্থলে নাঈম হাসান তার জাতীয় দলের পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ ও তাদের সঙ্গে থাকা সাধারণ পোশাকের সোর্স কোনো কথা শোনেনি। উল্টো ‘তুই আসামি, কথা বলবি না’ বলে তাকে অটোরিকশা থেকে নামানোর জন্য গলা টিপে ধরা হয়। নাঈম এর প্রতিবাদ করলে পুলিশের সোর্স সোহেল একটি পাইপ দিয়ে এবং বাকি পুলিশ সদস্যরা লাঠি দিয়ে তাকে নির্বিচারে মারধর করতে শুরু করে। উপস্থিত শতাধিক সাধারণ মানুষ নাঈমকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করার পরও পুলিশের মারমুখী আচরণ থামেনি। ঘটনাস্থল থেকেই ওসির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাঈমকে থানায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেন। থানায় নিয়ে যাওয়ার পরও নাঈম হাসানের ওপর মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। নিজের পরিচয় নিশ্চিত করার পরও ওসি আরিফুর রহমান অত্যন্ত উগ্র মেজাজে নাঈমকে চোখ নামিয়ে কথা বলার জন্য হুমকি দেন। কিন্তু ঠিক ওই মুহূর্তেই ওসির ব্যক্তিগত মুঠোফোনে একটি কল আসে। ওপর মহল থেকে আসা ওই ফোনের ওপাশ থেকে প্রকৃত সত্য জানতে পেরেই ওসির আগের সেই রুক্ষ ও অহংকারী সুর এক সেকেন্ডে ‘ভোলবদল’ করে ফেলে। মুহূর্তেই সুর নরম করে ওসি বলে ওঠেন, ‘ভাইয়া আপনি বসেন।’ অথচ এর কিছুক্ষণ পর নাঈমের বাবা মাহবুব আলম থানায় পৌঁছালে তাকে দীর্ঘক্ষণ ভেতরে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি এবং স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে ঢুকতে পারলেও ওসির কাছ থেকে চরম অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে পরবর্তীতে ওসি আরিফুর রহমান সম্পূর্ণ বিপরীত দাবি করে বলেন যে, তিনি এই অভিযানের বিষয়ে কিছুই জানতেন না এবং এসআই শফিক তার অনুমতি ছাড়াই এই কান্ড ঘটিয়েছেন। তবে থানার অভ্যন্তরীণ সূত্র নিশ্চিত করেছে, ওসির সরাসরি নির্দেশেই এই অভিযান ও নাঈমকে ধরে আনার কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। শনিবার বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে নাঈম হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আইডি কার্ড দেখানোর পরও ওরা আমাকে পাইপ দিয়ে মেরেছে। আজ আমার ওপর হাত তুলেছে, কাল অন্য কারো ওপর তুললে তার পাশে কে দাঁড়াবে? আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’ ক্রিকেটার নাঈমের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলার ঘটনায় শনিবার সকালে তার ভাই সাব্বির আলম বাদী হয়ে খুলশী থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন, যেখানে মারধর ও অপহরণ চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। অভিযুক্ত এসআই শফিকুল ইসলাম ও কনস্টেবল রাসেলসহ তিন পুলিশ সদস্যকে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং পুলিশের সোর্সকে আটক করা হয়েছে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বয়ং নাঈম হাসানের বাসায় গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং পুলিশের এই আচরণকে ‘চরম অপেশাদার’ বলে আখ্যা দিয়ে বিভাগীয় মামলার আশ্বাস দিয়েছেন। এদিকে এই ঘটনার পর খুলশী থানার ওসি আরিফুর রহমানের অতীত আমলনামা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী এলাকা কোম্পানিগঞ্জ থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা আরিফুর রহমান সে সময় পুরস্কৃতও হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবিদ্বার থানায় থাকাকালীন ঘুষ কেলেঙ্কারিতে তার নাম জড়ায়। তবে গত ৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি নিজেকে ছাত্রদলের সাবেক নেতা দাবি করে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় পোস্টিং বাগিয়ে নেন তিনি। সেখানেও তার বিরুদ্ধে ভূমি দখল, মাদক কারবারিদের সহায়তা এবং সহকর্মীদের বিরুদ্ধে বিষোদগারের মারাত্মক সব অভিযোগ ওঠে, যা সিএমপির ভেতরেও তাকে নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। সোনা চোরাচালানের ভুল তথ্যের আড়ালে একজন জাতীয় বীরকে এভাবে হেনস্তা করার ঘটনায় পুরো চট্টগ্রামজুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় বইছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com