
# আড়ালে থাকা শত শত বছরের হিসাব প্রকাশ্যে আসছে ! # টাকা যায় কার পকেটে? মাজারের কোটি কোটি টাকার হিসাব নিয়ে দীর্ঘদিনের রহস্য। # ‘পাবলিক প্রোপার্টিতে ভাগ-বাঁটোয়ারা চলবে না’: জেলা প্রশাসকের চরম হুঁশিয়ারি। # আমরাও খাচ্ছি, মাজারও চলছে’: মোতোয়াল্লির অকপট স্বীকারোক্তি ও অসহায়ত্ব। # আদালতের রায় ও ঐতিহ্যের দোহাই: প্রশাসনের ঝটিকা অভিযানে ক্ষুব্ধ মাজার কর্তৃপক্ষ। # মাজার-মসজিদ-মাদ্রাসার সমন্বয়ে গড়ে উঠবে বিশ্বমানের ‘ইসলামিক কমপ্লেক্স’।
আব্দুল হালিম সাগর: সিলেটের আধ্যাত্মিক ও ঐতিহ্যের স্মারক হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শত বছরের আড়াল ভাঙতে শুরু করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তদের দেওয়া কোটি কোটি টাকার দান, অনুদান ও নজরানার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব না থাকায় জনমনে দীর্ঘদিনের যে কৌতূহল ও প্রশ্ন ছিল, এবার তার সমাধানে সরাসরি হস্তক্ষেপে নেমেছে সিলেট জেলা প্রশাসন ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। গত বুধবার এবং শুক্রবার সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের নেতৃত্বে নেওয়া নজিরবিহীন কিছু পদক্ষেপের ফলে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এক ঐতিহাসিক মোড় আসতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো এই দুই মাজারের আয়-ব্যয়কে সরকারি জবাবদিহিতা এবং স্বচ্ছতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা নিয়ে বর্তমানে সিলেটে ব্যাপক তোলপাড় চলছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ভক্তি ও মানত নিয়ে এই দুই ওলির দরগাহে ভিড় করেন। নগদ অর্থ ছাড়াও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালঙ্কার, গরু-ছাগল ও মূল্যবান সামগ্রী দান করেন ভক্তরা। স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী, প্রতিদিন এখানে লাখ লাখ টাকা এবং বছরে কোটি কোটি টাকার দান জমা পড়ে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় যায়, কীভাবে ব্যয় হয় কিংবা কারা এর নিয়ন্ত্রক—তা সাধারণ মানুষের কাছে বরাবরই ছিল রহস্যময়। ২০০৩ সালে মাজারের ঐতিহ্যবাহী গজার মাছের মৃত্যুর ঘটনার পর মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হলেও দীর্ঘ দুই দশকেও আয়ের কোনো স্বচ্ছ হিসাব জনসমক্ষে আসেনি। সম্প্রতি মাজারের উন্নয়নে সরকারি অর্থায়নে ৩০ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্পকে কেন্দ্র করে এই অস্বচ্ছতার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে। জানা যায়, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে ২৫ কোটি টাকা সরকার এবং ৩ কোটি টাকা সিটি কর্পোরেশন দিলেও বাকি ২ কোটি টাকা মাজার কর্তৃপক্ষের দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও সেই টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয় মাজার কর্তৃপক্ষ, যা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে এবং মাজারের আয়ের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চায়।
এই প্রেক্ষাপটে গত বুধবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিলেট সিটি কর্পোরেশন, ওয়াক্ফ এস্টেট, ইসলামিক ফাউন্ডেশন এবং মাজার পরিচালনা কমিটির প্রতিনিধিদের নিয়ে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজারের আর্থিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, মাজারের আয় সুসংগঠিতভাবে কোনো জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ব্যক্তিরা নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছেন। জেলা প্রশাসক কঠোর ভাষায় সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর দরগাহ কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়; এটি সিলেটের তথা সমগ্র দেশের মানুষের একটি পাবলিক প্রোপার্টি। ফলে এর প্রতিটি পয়সার হিসাব রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সভায় তাৎক্ষণিকভাবে মাজার কর্তৃপক্ষের কাছে হিসাবপত্র চাওয়া হলে তারা কোনো নির্ভরযোগ্য বা পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড উপস্থাপন করতে পারেননি, যা প্রশাসনের সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করে। গত শুক্রবার সকালে মাজার পরিদর্শনে গিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। তিনি বলেন, “এতদিন ধরে মাজারের আয়ের টাকা একদল ব্যক্তি নিজেদের মর্জিমতো খরচ করেছেন। এটি পুরোপুরি নীতিবিরুদ্ধ। এখন থেকে প্রতি দিনের আয়ের রেকর্ড রাখার কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আগামী এক মাস জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সরাসরি উপস্থিত থেকে আয়-ব্যয় পর্যবেক্ষণ করবেন। একই সাথে এই মাজারগুলোকে কেন্দ্র করে একটি উচ্চমানের ‘ইসলামিক কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে, যেখানে মাজারের দান ও সরকারি বরাদ্দের সমন্বয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা ও আমলের কেন্দ্র তৈরি হবে।” প্রশাসনের এই উদ্যোগের ফলে মাজারের যাবতীয় আয় এখন থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং নিয়মিত অডিটের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।
প্রশাসনের এই আকস্মিক ও কঠোর অবস্থানে মাজারের দীর্ঘদিনের সেবায়েত ও মোতোয়াল্লিদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ও এক ধরনের আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। শাহজালাল (রহ.) মাজারের মোতোয়াল্লি ফতেহ উল্লাহ আল আমান স্বীকার করেছেন যে, মাজারের আয় থেকে তারা বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারীরা জীবিকা নির্বাহ করেন এবং মাজারের খরচ মেটান। তবে তিনি আয়ের কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিতে পারেননি। প্রশাসনের এমন কঠোরতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেছেন যে, জেলা প্রশাসক তাদের কথা শোনার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিচ্ছেন। আদালতের রায় এবং চলমান মামলার দোহাই দিয়ে তারা প্রশাসনের হস্তক্ষেপকে প্রথা ও ঐতিহ্যের পরিপন্থী বলে দাবি করছেন। তবে তারা এও স্বীকার করেছেন যে, প্রস্তুতির অভাবে তারা পর্যাপ্ত হিসাব দেখাতে পারেননি।
এদিকে সিলেটের ওলামা সমাজ এবং সচেতন সাধারণ মানুষ প্রশাসনের এই সাহসী পদক্ষেপকে ঐতিহাসিকভাবে সাধুবাদ জানিয়েছেন। সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবীব আহমদ শিহাব ও দরগা মসজিদের মুফতি হাসানসহ বিশিষ্ট আলেমরা বলছেন, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী মাজারে আসা দান-খয়রাতের প্রধান হকদার হলেন এতিম, মিসকিন ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রভাবশালী ও বিত্তশালীরা যদি এই অর্থ ভোগ করেন, তবে তা ইসলামের দৃষ্টিতেও জায়েজ নয়। সিলেটের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এই আর্থিক স্বচ্ছতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা মনে করছেন, যদি সঠিক তদারকি নিশ্চিত হয়, তবে এই মাজারের আয় দিয়েই সিলেটের কয়েকশ এতিমখানা ও মাদ্রাসার আমূল পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। প্রশাসন ও সচেতন মহলের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান সিলেটের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলোর ব্যবস্থাপনায় এক নতুন যুগের সূচনা করতে যাচ্ছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com