
প্রধান প্রতিবেদক: অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অত্যন্ত সংবেদনশীল শাখা ‘ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট’ যেন এখন এক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। এই ইউনিটের শীর্ষ পদে বসে আছেন এডিশনাল ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান। দীর্ঘ আট বছর একই ইউনিটে দায়িত্ব পালন করার পর, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুবাদে এক রহস্যময় প্রভাবে তিনি আবারও চেনা দপ্তরে ফিরে এসেছেন। আর এসেই তদন্ত বাণিজ্য, একক প্রভাব বিস্তার ও সৎ কর্মকর্তাদের কোণঠাসা করার এক নজিরবিহীন পরিবেশ তৈরি করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে খোদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গুরুতর অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিদেশে শত কোটি টাকা পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ চুরি মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন এই রায়হান উদ্দিন খান। কিন্তু দীর্ঘ নয় বছর মামলাটি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেও তিনি দেশীয় মূল অপরাধী ও আন্তর্জাতিক হ্যাকারদের আড়াল করার এক সুনিপুণ কৌশল অবলম্বন করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই মহাচুরির তদন্তকে ঢাল বানিয়ে তিনি নিজেই বিপুল অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত রিজার্ভ চুরির মামলার তদন্তে রায়হান উদ্দিন খানের ভূমিকা শুরু থেকেই ছিল চরম বিতর্কিত ও রহস্যে ঘেরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া গোপন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি ‘ডিজিটাল চেইন-অফ-কাস্টডি’ বজায় রাখেননি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই এবং বিএই সিস্টেমস বা ক্যাসপারস্কির মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যখন এই সাইবার হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার ‘লাজারাস গ্রুপ’কে দায়ী করেছে, তখন রায়হান উদ্দিন খান সেই অকাট্য ডিজিটাল এভিডেন্সগুলোর কোনো আইনি ভিত্তি বা কারিগরি লগ আদালতে উপস্থাপন করেননি। সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের বিষয় হলো, এত বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা বা সন্দেহভাজন কারোরই ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি রেকর্ড করেননি। উল্টো রাকেশ আস্তানা নামের এক ভারতীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞকে এনে হ্যাক হওয়া সিস্টেম পরীক্ষা করানোর নামে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও আইটি লগ মুছে ফেলার সুযোগ করে দেওয়া হয়, যার কোনো দাপ্তরিক স্বাক্ষর বা লগ তিনি সংরক্ষণ করেননি। ফলে আদালতে এই তদন্তের গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের শেষ দিকে মামলার তৃতীয় তদন্ত কর্মকর্তা মং থোয়াই মারমা আনুষ্ঠানিকভাবে রায়হান উদ্দিনের পূর্বের তদন্তের দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলো নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে জানান যে, মামলাটিতে চার্জশিট দেওয়ার মতো কোনো তথ্যপ্রমাণই অবশিষ্ট রাখা হয়নি। কিন্তু চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই সত্য তুলে ধরার কয়েকদিনের মধ্যেই অদৃশ্য ইশারায় সৎ কর্মকর্তা মং থোয়াই মারমাকে সরিয়ে মামলাটি পুনরায় রায়হানের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা ফরহাদ কবীরের হাতে তুলে দেওয়া হয়, যাতে দ্রুত একটি দায়সারা চার্জশীট দিয়ে ভেতরের রাঘববোয়ালদের রক্ষা করা যায়। অভিযোগে প্রকাশ, বাংলাদেশ ব্যাংকের অত্যন্ত সুরক্ষিত ‘গো এমএল’ (GOAML) সিকিউর চ্যানেলের একমাত্র এক্সেসধারী হিসেবে রায়হান উদ্দিন খান গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন ব্যাংক ও ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের অতি সংবেদনশীল ও গোপন রিপোর্টগুলো তদন্ত শুরু হওয়ার আগেই তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মূল অপরাধীদের কাছে পাচার করে দিতেন। এই তথ্য বাণিজ্য এবং মিডিয়া ট্রায়ালের জন্য রায়হান উদ্দিন একটি বিশেষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন, যার মধ্যে রয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কতিপয় ক্যাডার এবং কয়েকজন আজ্ঞাবহ সংবাদকর্মী। তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে লক্ষ্যবস্তু বানানো কোনো ব্যবসায়ী বা ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পোষা সাংবাদিক দিয়ে মনগড়া নেতিবাচক খবর প্রকাশ করা হতো। এরপর সেই নিউজের সূত্র ধরে সিআইডি থেকে অনুসন্ধান বা ইনকোয়ারি শুরু করতেন রায়হান। পরবর্তীতে নিজের বিশ্বস্ত টিম দিয়ে মোটা অঙ্কের এজেন্ডাভিত্তিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘ম্যানেজড’ তদন্ত চালিয়ে আসামিদের সম্পূর্ণ দায়মুক্ত বা ক্লিনচিট করে দেওয়া হতো। তার আমলে হওয়া ফিন্যান্সিয়াল ইনকোয়ারি এবং তা থেকে হওয়া নিয়মিত মামলার সংখ্যার অনুপাত বিশ্লেষণ করলেই এই বিপুল অর্থ বাণিজ্যের প্রমাণ মিলবে। can রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেকে বঞ্চিত দাবি করে পদোন্নতি বাগিয়ে নিলেও, রহস্যজনক কারণে কোনো field-level বা মাঠপর্যায়ের ভালো পোস্টিংয়ে না গিয়ে বিশেষ তদবিরে তিনি আবারও সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটে জেঁকে বসেন। বর্তমানে তিনি এই ইউনিটের এডিশনাল ডিআইজি। অথচ সিআইডির ইতিহাসে নজিরবিহীনভাবে পাঁচজন পুলিশ (SP) সুপারকে তার অধীনে রিপোর্ট করতে বাধ্য করা হচ্ছে। বর্তমানে তিনি আইজিপি এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বক্স চৌধুরীর নাম ভাঙিয়ে গোটা ইউনিটে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছেন। যেকোনো সৎ কর্মকর্তা তার এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই তাকে দুর্গম এলাকায় বদলি বা বিভাগীয় মামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে।সংবেদনশীল ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মানিলন্ডারিং মামলার আসামিদের ব্ল্যাকমেইল করার মাধ্যমে রায়হান উদ্দিন খান নিজে শত শত কোটি টাকা দুবাইসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন বলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। সিআইডির ভেতরের ও বাইরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন যে, রায়হান সাহেবের প্রশাসনিক ও আর্থিক বলয় এতটাই শক্তিশালী যে, তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক কথা বলার সাহস সহজে কেউ পায় না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া আবেদনে ভুক্তভোগী নাগরিক ও সচেতন মহল জোর দাবি জানিয়েছেন যে, সিআইডির মতো একটি সংবেদনশীল ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে এমন একজন বিতর্কিত ও আর্থিক অভিযোগে অভিযুক্ত কর্মকর্তার অবস্থান দেশের আর্থিক অপরাধ দমন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিচ্ছে। অবিলম্বে তাকে ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট থেকে প্রত্যাহার করে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা না হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলার প্রকৃত সত্য কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না, বরং অপরাধীদের চিরতরে সুরক্ষা দেওয়ার একটি আইনি দলিল তৈরি হবে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com