# গোয়াইনঘাট জুড়ে ‘বালুখেকোদের’ তাণ্ডব। # ২৬ কোটির ইজারা নিয়ে ১১০ কিমি জুড়ে রাজত্ব। # ভাঙনের মুখে কোটি টাকার সেতু, ইজারার আড়ালে বালু লুট। # নেপথ্যে ইউএনও-ওসিসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা। # নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’ ও দানবীয় এক্সকাভেট ফেলুডার দিয়ে নদী ধ্বংস।
বিশেষ প্রতিবেদন: সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য দিবালোকে চলছে বালু ও পাথর লুটের মহোৎসব। ইজারার শর্ত ভেঙে স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র ও রাজনৈতিক সিন্ডিকেট পিয়াইন নদী, গোয়াইন নদী, ডাউকি অববাহিকাসহ হাজিপুর-আহারকান্দি বালু মহালকে চরম ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, টাস্কফোর্সের মাঝেমধ্যে লোকদেখানো অভিযান চললেও নেপথ্যে থানা পুলিশ, বিট অফিসার ও উপজেলা প্রশাসনের ‘মৌন সম্মতি’ বা নীরব ভূমিকার কারণেই থামানো যাচ্ছে না এই পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড। অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর সিলেটের জেলা প্রশাসন (রাজস্ব শাখা) থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় মাত্র একটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হয়। ‘হাজিপুর-আহারকান্দি’ নামের এই মহালটি ২৬ কোটি টাকায় ইজারা নেন ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্ণধার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি কোম্পানীগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আলফুর ভায়রা হিসেবে পরিচিত। গত ১৬ এপ্রিল আব্দুল্লাহ আল মামুন মহালটির দখল বুঝে নেওয়ার পর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ অন্তত ২০ জন বিএনপি ও যুবদল নেতাকে ব্যবসায় অংশীদার (পার্টনার) করেন। মে মাসের প্রথম দিকে বৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হলেও, মে মাসের শেষ দিকে এসে এই রাজনৈতিক সিন্ডিকেটের শেল্টারে শুরু হয় বেপরোয়া অবৈধ বালু লুট। এই রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় স্থানীয় প্রভাবশালী কামরুল-খায়রুল গংদের বেপরোয়া সিন্ডিকেট পুরো উপজেলার নদী অববাহিকা নিয়ন্ত্রণ করে শত কোটি টাকার সরকারি সম্পদ ধ্বংসের ছক এঁকেছে। সরকারি নির্দেশনায় নদী থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতি বা হাতে তোলার স্পষ্ট নিয়ম থাকলেও গোয়াইনঘাটের হাজিপুর, আহারকান্দি, জাফলং ও বিছনাকান্দির বিভিন্ন স্থানে ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার ও নিষিদ্ধ ‘বোমা মেশিন’। এছাড়াও নদীর তীরবর্তী ফসলি জমি ও চা বাগানের পাশ থেকে মাটি খুঁড়ে বালু তুলতে ব্যবহার করা হচ্ছে দানবীয় এক্সকাভেটর (ভেকু) ও ফেলুডার। কতিপয় বিএনপি ও যুবদল নেতার শেল্টারে প্রতি রাতে কামরুল-খায়রুল গংরা বোমা মেশিন দিয়ে বালুর সঙ্গে পাথরও উত্তোলন করছে। দিনের আলোয় লোকদেখানো নিয়মের পর রাত গভীর হতেই বোমা মেশিন দিয়ে চলে এই পাথর উত্তোলনের উৎসব। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও পাড় ক্রমান্বয়ে ধসে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় জনবসতির ওপর। ডাউকি ও পিয়াইন নদীর ওপর নির্মিত কোটি কোটি টাকার সেতু ও গ্রামীণ রাস্তাঘাট ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। নদীপাড়ের শত শত একর কৃষিজমি ও চা বাগানের পাশ নদীগর্ভে তলিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। শুধু তাই নয়, যান্ত্রিক ঝাঁকুনি ও তেলের লিকেজের কারণে নদীর মাছ ও জলজ উদ্ভিদ পুরোপুরি ধ্বংসের মুখে পড়েছে, যা জলজ জীববৈচিত্র্যের চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, এর ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে এবং বায়ু ও পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। ইজারার শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত দাগ ও মৌজার ভেতরে বালু উত্তোলন করার কথা থাকলেও ইজারাদার চক্র তা অমান্য করে প্রায় ১১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বালু উত্তোলন ও রয়্যালটি কালেকশন করছে। মাত্র একটি বালু মহালের লিজ নিয়ে পুরো উপজেলার নদী অববাহিকা দখল করে নেওয়া হয়েছে। সদর ইউনিয়নের ভেতরে পরগনা বাজার, তিতরাই ও লাঠি পশ্চিমপাড়ে অবৈধ ক্যাম্প বসিয়ে রসিদের মাধ্যমে বেপরোয়া রয়্যালটি আদায় করা হচ্ছে। ৩ কিলোমিটার জুড়ে ধ্বংসযজ্ঞ: দক্ষিণ প্রতাপপুর ও কন্যাঙ্গল নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর বুক ঝাঁঝরা করে ফেলা হচ্ছে। বালুর নির্ধারিত রয়্যালটি প্রতি ফুট ৫ টাকার স্থলে জোরপূর্বক ১০ টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে। ফলে একটি ২০০ ফুটের ট্রাক এবং সাধারণ নৌকাগুলো থেকে ১ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী জনগণের স্পষ্ট অভিযোগ, বালু ব্যবসার এই সিন্ডিকেটের পেছনে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হচ্ছে। সদর বিট অফিসার ও পশ্চিম জাফলং বিট অফিসারের মাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করে এই অবৈধ কাজ চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের পকেটে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা যাওয়ার কারণেই পুলিশ নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, “দিনের বেলা প্রশাসন মাঝে মাঝে দু-একটা নৌকা বা মেশিন আটক করে জরিমানা করে নাটক সাজায়। কিন্তু রাত গভীর হতেই ওসির মদদে শত শত ট্রলি ও বোমা মেশিন আবার সচল হয়ে ওঠে।” এদিকে প্রশাসনের চাতুরী নাকি গাফিলতি—তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে গোয়াইনঘাট থানা লেবার ফেডারেশনের সভাপতি মদরিছ আলী বলেন, “গত ১৩ এপ্রিল আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। দাবি ছিল, বালু মহালের সীমানায় লাল পতাকা টাঙিয়ে নির্দিষ্ট দাগ-খতিয়ান স্পষ্ট করে দেওয়া হোক। কিন্তু প্রশাসন চিঠির কোনো দাগ না দিয়ে ‘ঝুমলা’ (দাগ-খতিয়ান উল্লেখ না করে) লিজ দিয়ে দিয়েছে। এর মানে প্রশাসনই ইজারাদারকে বাইরে বেআইনি কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।”
অভিযোগ অস্বীকার ইজারাদারের, প্রশাসন ও পুলিশের দায়সারা বক্তব্য সব অভিযোগ অস্বীকার করে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, “আমরা সরকারের সব নিয়ম মেনে ইজারার ভেতরেই বালু উত্তোলন করছি। ইজারার শর্তের বাইরে কিছু করছি না এবং বোমা মেশিন চালানোর অভিযোগ সত্য নয়।” গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে এবং ইজারার বাইরে বালু উত্তোলন করার কোনো সুযোগ নেই। এমনটা হলে পুলিশ দ্রুত কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেবে।” গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “আমরা খবর পেয়ে অভিযান চালিয়ে বোমা মেশিন বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও চললে অভিযান হবে।” তবে লিজের সীমানা লঙ্ঘনের বিষয়ে তিনি কিছুটা দায় এড়িয়ে বলেন, “লিজ দিয়েছেন ডিসি ও এডিসি স্যার, আপনারা উনাদের কাছে জানতে চান। আমাকে শুধু দখল বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছিল, আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।” সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নুরের জামান চৌধুরী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ইজারাদার যদি কোনোভাবেই লিজের শর্ত ভঙ্গ করেন বা সীমানার বাইরে যান, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই বোমা মেশিন ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।” পরিবেশ আইনবিদ ও সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজের মতে, যতক্ষণ না স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লোকদেখানো অভিযান বন্ধ করে কঠোর ও সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবে, ততক্ষণ এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঠেকানো সম্ভব নয়। নদী ও পরিবেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে এই ‘বোমা মেশিন’ সিন্ডিকেটের মূলহোতাদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com