
সম্পাদকীয়: বাজার থেকে সাধারণ মানুষ অন্ন সংস্থানের জন্য যা কিনছে, তা কি আদৌ খাদ্য নাকি সুপ্ত বিষ? সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম ও গবেষণায় জনস্বাস্থ্যের যে রূঢ় চিত্র উঠে এসেছে, তা এক কথায় শিউরে ওঠার মতো। একশ্রেণির অতি মুনাফালোভী অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কারণে দেশের পুরো খাদ্যশৃঙ্খল আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। চাল, ডাল, মাছ, মাংস থেকে শুরু করে জীবন রক্ষাকারী গুঁড়া দুধ কিংবা শিশুদের প্রিয় চিপস—কোনো কিছুই আজ বিষাক্ত রাসায়নিকের ছোবল থেকে মুক্ত নয়। জনস্বাস্থ্যের এই চরম সংকট আমাদের জাতীয় অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি ল্যাবরেটরির পরীক্ষার প্রতিবেদনগুলো একেকটি আতঙ্কের দলিলে পরিণত হয়েছে। দেখা গেছে: আমাদের প্রধান খাদ্য চালে মিশে আছে অতিমাত্রায় আর্সেনিক ও ক্রোমিয়াম। হলুদের গুঁড়ায় ক্ষতিকর সিসা এবং মাছ ও মুরগির মাংসে পাওয়া যাচ্ছে মানবদেহের জন্য সংবেদনশীল অ্যান্টিবায়োটিক। শিশুদের খাবারের ৬৫ শতাংশে মিলছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক ‘অ্যাক্রিলামাইড’। মিষ্টি ও জিলাপিতে টেক্সটাইল হাইড্রোস এবং রেস্তোরাঁর খাবারে কাপড়ের রং ব্যবহারের মতো পৈশাচিক জালিয়াতি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। যে খাবার খেয়ে মানুষের পুষ্টি ও জীবনীশক্তি পাওয়ার কথা, সেই বিষাক্ত খাবার খেয়ে দেশের মানুষ আজ ক্যানসার, লিভার সিরোসিস ও কিডনি বিকল হওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা এক শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের দিকে ঠেলে দিচ্ছি, যা একটি জাতির জন্য আত্মঘাতী। আশ্চর্যের বিষয় হলো, খাদ্যে বিষপ্রয়োগ রুখতে দেশে আইনের কোনো ঘাটতি নেই। নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩, ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯-এর মতো বেশ কিছু কঠোর আইন কার্যকর রয়েছে। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান পর্যন্ত রাখা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত আইন থাকা সত্ত্বেও কেন ভেজালের এই জয়জয়কার? এর একমাত্র কারণ হলো আইনের যথাযথ, নিয়মিত ও কঠোর প্রয়োগের অভাব। এই জাতীয় মহাসংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে সরকারকে এখনই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। কেবল বিশেষ উৎসব বা পার্বণে লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালালে এই গভীর সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। মাঠ প্রশাসনে বছরজুড়ে নিয়মিত নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। ভেজাল প্রমাণিত হলে কেবল নামমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক কঠিন শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কারও নেই। অসাধু ব্যবসায়ীদের লোভের বলি হতে পারে না সাধারণ নাগরিক। পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষায় সরকার বিদ্যমান সব আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা।
ফিরোজ আহম্মেদ মোল্লা, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com