
কবির আহমেদ মানিক, চট্টগ্রাম ব্যুরো: নিয়োগ পেয়ে করার কথা ছিল ঝাড়ুদার বা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর কাজ, কিন্তু তিনি চেয়ার-টেবিলে বসে দিব্যি সামলাচ্ছেন চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) আইটি সেকশনের কম্পিউটার অপারেটরের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। শুধু তাই নয়, খোদ নিয়োগের আবেদনেই করা হয়েছে চরম জালিয়াতি। অষ্টম শ্রেণি পাস ইয়াছমিন আক্তার নামের এক পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিরুদ্ধে এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ওঠায় সিডিএ জুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এই ঘটনায় খোদ সিডিএ-এর কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২১ মার্চ ইয়াছমিন আক্তার নামের এক নারী সিডিএ সচিব বরাবর পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদের জন্য আবেদন করেন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৩ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি একটি পত্রিকার বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন সিডিএ-তে কিছু সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। উক্ত পদে প্রার্থী হিসেবে তিনি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস বলে উল্লেখ করেন। আবেদনে তিনি পিতার নাম মৃত মোহাম্মদ মেহের আলী এবং মাতার নাম মনোয়ারা বেগম উল্লেখ করেন। তার স্থায়ী ঠিকানা দেওয়া হয়: গ্রাম- গোপাল নগর পূর্বপাড়া (তবদল মেম্বারের বাড়ি), ডাকঘর- রসুলপুর, থানা- দেবিদ্বার, জেলা- কুমিল্লা। অভিজ্ঞতার কলামে তিনি উল্লেখ করেন, 'ম্যাক্স হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক লিমিটেড' (Max Hospital & Diagnostic LTD) নামক প্রতিষ্ঠানে ০১/০১/২০১১ থেকে ৩০/১২/২০১৪ পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
আইডি কার্ড কেটে জন্ম নিবন্ধন নম্বর বসানোর জালিয়াতি: এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় জালিয়াতিটি ধরা পড়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) ও জন্ম নিবন্ধন নম্বরের ঘরে। আবেদনের ফর্মে যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্রের (ID) নম্বর থাকার কথা, সেখানে কৌশলে আইডি নম্বরটি কেটে দিয়ে পাশে বসানো হয়েছে জন্ম নিবন্ধনের নম্বর। অনুসন্ধানী প্রতিবেদকের হাতে আসা তথ্যে প্রমাণিত হয়েছে যে, আইডি কার্ডের জায়গায় ব্যবহৃত ১৯৯২১৫৯১৬৩৫১২০২০৮ নম্বরটি মূলত তার জন্ম নিবন্ধন নম্বর। মূলত মূল পরিচয় লুকিয়ে বা কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এই জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সমঝোতার চেষ্টা অভিযুক্তের এইসব অনিয়ম ও জালিয়াতির বিষয়ে জানতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ইয়াছমিন আক্তারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান এবং পরে কথা বলবেন বলে জানান। তবে পরবর্তীতে ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে জাতীয় দৈনিক ‘পর্যবেক্ষণ’-এর চট্টগ্রাম ব্যুরো অফিসে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে ফোন করিয়ে বিষয়টি সমঝোতার চেষ্টা চালান তিনি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: এই বিষয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এর বর্তমান চেয়ারম্যান নুরুল করিম বলেন, "আমি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এই দায়িত্বে যুক্ত হয়েছি। বিগত সময়ের এই বিষয়টি সম্পর্কে আমি আগে অবগত ছিলাম না। তবে এখন বিষয়টি জানতে পেরেছি। আমি এর খোঁজখবর নিচ্ছি এবং তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।"
ক্ষুব্ধ নগর পরিকল্পনাবিদ ও বুদ্ধিজীবী মহল: নগর পরিকল্পনাবিদ ও চট্টগ্রামের অভিজ্ঞ মহলের মতে, পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদে নিয়োগ পেয়ে আইটি সেকশনে কাজ করা এবং আবেদনের ফর্মে জালিয়াতি করা—পুরো প্রক্রিয়াটিই সম্পূর্ণ অবৈধ ও অনৈতিক। সিডিএ-র মতো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অন্য বিভাগের কর্মকর্তারাও এই ধরনের জালিয়াতির ঘটনায় হতবাক। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ব্যক্তি, রাজনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা বলছেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মূল কাজ হলো সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা ও পরিপক্ক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নগরীর উন্নয়ন নিশ্চিত করা। কিন্তু খোদ সিডিএ-র ভেতরেই যদি এমন অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা চলে, তবে নগরবাসী চরম হতাশ হবে। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে এবং নগরবাসীর ভোগান্তি দূর করতে সিডিএ-কে অবিলম্বে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তা না হলে এই ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা সিডিএ-র ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকেও বাধাগ্রস্ত করবে। সিডিএ-র এই নিয়োগের পেছনে আর কোন কোন কর্মকর্তা বা সিন্ডিকেট জড়িত এবং কী প্রক্রিয়ায় এই অনৈতিক নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে, তা উদঘাটনে সরেজমিনে আরও গভীর অনুসন্ধান চলছে।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com