
আব্দুল হালিম সাগর : সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা জৈন্তাপুর এখন ভারতীয় পণ্যের অবৈধ চোরাচালানের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুটে পরিণত হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার ভারতীয় চিনি, মহিষ, কসমেটিকস, শাড়ি, থ্রি-পিস ও মাদক দেদারসে দেশে প্রবেশ করছে। স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, এই বিশাল চোরাচালান সাম্রাজ্য নির্বিঘ্নে চলার পেছনে কাজ করছে একটি শক্তিশালী বহুমাত্রিক সিন্ডিকেট, যার অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে নাম এসেছে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরের কিছু অসাধু সদস্যসহ স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের। দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, চোরাচালানের এই নিরাপদ রুট সচল রাখতে সীমান্ত থেকে শুরু করে মহাসড়ক পর্যন্ত দিতে হয় মোটা অঙ্কের মাসোহারা। আর এই মাসোহারা বা সাপ্তাহিক ‘টোকেন’ বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে থানায় গড়ে উঠেছে নির্দিষ্ট ‘লাইনম্যান’ প্রথা।
এই সিন্ডিকেটের নেপথ্য খুঁজতে গিয়ে জৈন্তাপুর মডেল থানায় কর্মরত পুলিশ সদস্য আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে চোরাচালান চক্রের সঙ্গে সরাসরি সখ্যতা এবং লাইন নিয়ন্ত্রণের সুনির্দিষ্ট ও গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে একই থানায় কর্মরত থাকার সুবাদে তিনি এলাকায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে চোরাই পণ্য আনার ক্ষেত্রে চোরাকারবারি দলের সঙ্গে সাপ্তাহিক ও মাসিক চুক্তিতে সীমান্ত ‘লাইন’ পরিচালনা করেন এই পুলিশ সদস্য। সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি এখন জৈন্তাপুর থানার ‘লাইনম্যান’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন। শুধু লাইন পরিচালনা করাই নয়, ভারত থেকে অবৈধ পথে সীমান্ত পার করে আনা চোরাই মোটরসাইকেল সিলেটে এনে বিক্রির সিন্ডিকেটের সঙ্গেও তিনি সরাসরি জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, খোদ এই পুলিশ সদস্যের নিজের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ভারত থেকে অবৈধভাবে আনা এবং এটিতে একটি ভুয়া নম্বর প্লেট ব্যবহার করা হচ্ছে। মোটরসাইকেলটির পেছনে ‘সিলেট-ল ১২-১৫৭১’ লেখা নম্বর প্লেট দৃশ্যমান থাকলেও বিআরটিএ-র রেকর্ড অনুযায়ী এর কোনো আইনসম্মত নিবন্ধন নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য সাংবাদিক পরিচয়ে যোগাযোগ করা হলে পুলিশ সদস্য আব্দুর রহিম কোনো সদুত্তর না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই বিশাল চোরাচালান সাম্রাজ্য একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে চালানো সম্ভব নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা প্রভাবশালী ব্যক্তি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, চোরাচালান চক্রের মূল হোতা (মহাজন) এবং মাঠ পর্যায়ের লাইনম্যানদের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। এই চক্রের প্রথম ধাপে রয়েছে ‘মহাজন সিন্ডিকেট’ বা মূল গডফাদাররা, যারা জৈন্তাপুর, তামাবিল ও সিলেটের কিছু চিহ্নিত বড় ব্যবসায়ী। তারা নিজেরা সীমান্তে না গেলেও ভারত থেকে শত শত কোটি টাকার পণ্য অবৈধ পথে নিয়ে আসার মূল পুঁজি ও জোগান দেন। এদের নিয়ন্ত্রণে থাকা নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী সীমান্ত থেকে পণ্য খালাস করে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর দায়িত্ব নেয়। দ্বিতীয় ধাপে, সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে এবং চোরাকারবারিদের আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা দিতে কাজ করে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও কয়েকজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। চোরাচালানের বড় চালানগুলো যখন বিভিন্ন ঘাট দিয়ে খালাস হয়, তখন এই রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাই প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে পেছন থেকে ‘রাজনৈতিক ঢাল’ হিসেবে কাজ করেন এবং লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পেয়ে থাকেন।
তৃতীয় ধাপে রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য ও থানার লাইনম্যান। তদন্তে উঠে আসা পুলিশ সদস্য আব্দুর রহিমের মতো ব্যক্তিরা, যারা দীর্ঘদিন একই এলাকায় থাকার সুবাদে কারবারিদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন, নিয়মিত ‘টোকেন’ বা মাসোহারা আদায় করেন এবং কোন সময়ে মহাসড়কে টহল শিথিল থাকবে সেই ‘লাইন’ বা গ্রিন সিগন্যাল কারবারিদের জানিয়ে দেন। সর্বশেষ চতুর্থ ধাপে কাজ করে মাঠ পর্যায়ের ঘাট শ্রমিক ও বর্ডার লাইনম্যানরা। শ্রীপুর, লালাখাল, ডিবির হাওর, ফুলবাড়ী ও তামাবিল সীমান্তের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকার কিছু স্থানীয় যুবক ও ঘাট শ্রমিক ওপার থেকে কখন পণ্য আসবে এবং বিজিবি বা পুলিশের টহল কোন দিকে আছে—সেই তথ্যগুলো ওপার ও এপার বাংলার কারবারিদের কাছে আদান-প্রদান করে। এদের মাধ্যমেই প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের কাছে টোকেনের টাকা পৌঁছানো হয়।
বর্তমানে এই রুটগুলো দিয়ে শ্রীপুর ও লালাখাল সীমান্ত দিয়ে সবচেয়ে বেশি আসছে ভারতীয় শাড়ি, থ্রি-পিস ও কসমেটিকস সামগ্রী। অন্যদিকে ডিবির হাওর ও ফুলবাড়ী সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে আনা হচ্ছে ভারতীয় চিনি ও গরু-মহিষের বড় বড় চালান। এছাড়া তামাবিল ও জাফলং সংলগ্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে কড়া নজরদারির চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা ম্যানেজ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসছে ভারতীয় মাদক, ফেনসিডিল ও অবৈধ বর্ডার-ক্রস মোটরসাইকেল। স্থানীয় সূত্র ও নাম প্রকাশে অবিচ্ছুক কয়েকজন কারবারির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চোরাচালানের পণ্যবাহী প্রতিটি গাড়ি যেমন পিকআপ, ডিআই ট্রাক বা সিএনজি জৈন্তাপুর থানা এলাকা পার হওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কোড বা টোকেন ব্যবহার করে। থানার কিছু বিশ্বস্ত ও দীর্ঘস্থায়ী সদস্য এই লাইনের টাকা সংগ্রহ ও রুট ক্লিয়ার রাখার দায়িত্ব পালন করেন। লাইনম্যানের সবুজ সংকেত পেলেই কেবল মহাসড়কে চোরাই পণ্যের গাড়ি নামে এবং বিনিময়ে প্রতি সপ্তাহে লাখ লাখ টাকার মাসোহারা চলে যায় সিন্ডিকেটের পকেটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে এমন সুনির্দিষ্ট চোরাচালান সিন্ডিকেট পরিচালনা ও ভুয়া নম্বরের অবৈধ মোটরসাইকেল ব্যবহারের ঘটনায় এবং স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের এমন প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততায় স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে সীমান্ত ও মহাসড়কে চোরাচালান রোধে প্রশাসনের কঠোর ভূমিকা রাখার কথা, সেখানে খোদ দায়িত্বশীলদের এমন ভূমিকা পুরো ব্যবস্থার ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে জৈন্তাপুর সীমান্ত এলাকার চোরাচালান বন্ধ, অবৈধ লাইনের হোতাদের চিহ্নিতকরণ এবং পুলিশ সদস্য আব্দুর রহিমসহ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও বিভাগীয় সুষ্ঠু তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো. ফিরোজ আহমেদ মোল্লা
নির্বাহী সম্পাদক আব্দুল হালিম সাগর
প্রকাশক কর্তৃক বি,এস, প্রিন্টিং প্রেস, ৫২/২ টয়েনবী সার্কুলার রোড, ঢাকা-১২০৩ থেকে মুদ্রিত ও ৮৭ পুরানো পল্টন টাওয়ার, পুরানো পল্টন লেন থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয় কার্যালয়: ২৬ দেলোয়ার কমপ্লেক্স (৫ম তলা), টিকাটুলী, ঢাকা-১২০৩।
মোবাইল: ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক-০১৭১৫৬৯৩৭৫৩, ০১৩১৩৮৪৬৫২৫, নির্বাহী সম্পাদক: ০১৭২২-০৬২২৭৪। E-mail: dailyporzobekkhonbd.com